ঘুমের জন্য রোদন
নিজেরে শোয়াত রাইখা আমি উইঠা পড়ি
ঘুমের আকালের জঙলা ঘাসে
না ঘুমায়া তাকায়া থাকি কিছু ঘুমের দিকেই
যদি সে ধরা দেয় শেষ রাইতে দূরান্তের উঁশ!
উঁশের সওয়ারেরা দূর দিয়া ঘোরে ফিরে,
যেন বা বাঁশতলায় আকালের জোনাকি
কতকটা জাহির হইয়া বাতিনে গড়ায়
হয়তো থাকতেছে কোনো কুয়াশায় ধানের হাওড়ের নিয়ড়ে।
এই দেখে আমি তো ভাবতেছি পাখি হইলে উইড়া গিয়া
উঁশের ভিতরে ডুবতে পারতাম
কাতর অঘুমা চোখ নিয়া কিছুকাল থাকতাম অফুরন্ত ঘুমের অতলে।
পাখি না হইয়া কেন হইছি আমি পাখির পালক!
মাতৃপাখি যারে ছাইড়া যায় আনমনে নাডানাল ক্ষেতে
ঘুম তারে দেখে দূর হতে,
যেন ভাবে, ত্যাজের বেদনা নিয়া থাকুক সে কিছুকাল একা একা
পৃথিবীর আরো সব অ-ঘুমা মানুষের অবিরাম জাগ্নার ভিতরে।
সিনেমা দেখার আগে
সিনেমা দেখার আগে আমরা স্ক্রিপ্ট দেখি
পথে শাহবাগের মোড়ে একটু বসি চায়ের দোকানে
উঠতি বয়সের ছেলে ও মেয়েরা কে কারে চোখ মারে
আমরা মজা পাই
মৌসুমের আগেই আমরার ছেলেমেয়েরা সাবালক হইতেছে!
চাঅলারে কই ‘মামা’ তাতে কিছুটা সাম্যবাদ হইল
পায়ে পড়ে না তার মাথার ঘাম
শার্ট ভিজতেছে বলে ভাবা যায়
আহা এই শট কি দারুণ,
যত দূর যাইতে পারি মধ্যবিত্তের শিল্প কলা
ততদূর দাড়ায়া কই, ঠিক পথের প্যাঁচালের মত, দারুন দারুন!
নিদারুণ হইলো না কি!
রিক্সাঅলারে জিগান যাইতে পারে নিদারুণ তার জীবন
প্যাডেলের পাশ দিয়া অতঅত দামি গাড়ি
আসমান ছোঁয়া বিল্ডিংগুলার নিচ দিয়া
স্ক্রিপ্ট দেখা চলতেছে
মধুমালা নার্গিস সাবানের বাঁসে আমরা শেষে
উত্তেজিতই হয়া পড়তাছি মনে হয়
কাজেই এই সময় গুলির শব্দ মোড়ে মোড়ে,
বেশ যায়, যাইতেই পারে
সিনেমার শেষের দিকে কিছু কিছু মারামারি
কিছু গলাবাজি
যদিও এইখানে স্ক্রিপ্টের ভিতর কেমন সুনসান বোবা মানুষেরা।
আমরা সিনেমা দেখতেছি কিছু লাশ পড়তাছে
তাতে তলে পড়তেছে সাবানের বাঁস
সহবাসের বদলে হাতমারা শেষ।
কাইল সকালে অফিসের কামের ফাঁকে এইখানে
মধ্যবিত্তের একটা বিপ্লব হইয়াই যাবে হয়তো।
রাইতের আগে একটা গান
সন্ধ্যার তারাদের নিচে একটা গান বান্ধনের আগে ভাবি
দূরের তারার আভাস এইখানে থাকতে পারে
গতহওয়া রৈদের টকটকা রঙের মধ্যে
যাওয়া আসা করুক আগামী কাইল ও
তাহার পরের আরো যত দিন
হাতের কাছে জঙলার ঘাসফুল, কয়গোছা উজাউড়ির মৌজ
কিছুটা লাগলে ভালো
তোমার জানালায় আমরার না-ফোটা জোছনা
কতক উঠতেই পারে এইখানে রক্তিপুন্যির চানে
তাতে মোটামুটি একটা গড়পড়তা জীবন আঁকা যায়।
শেষে দেখি লেখছি নিজেরই ছায়া কিছু
তাতে আসরের ওয়াক্তের বিলাপই মূল রঙ
যেন লেখা হইছি আমি একটা দু:খের গান
সন্ধ্যার নিরাবেলি মনে।
আমি একটা সিনেমার দর্শক
আমি তো শ্রোতা মাত্র
সন্ধ্যার আলাজালা মনে
বাঁশের পাতা আর জোনাকির গোপন আলাপের,
সঙ্গী তাদের হইতে পারলাম না
সেইতক ফারাকে দাড়ায়া তাই দেখি
নিসার আলাপের মইধ্যে পুরানা আন্ধাইরের মুখ
লেখে মুছে নিজেদের বোবা ইতিহাস
চৌকাঠের কিনারায় চাইরকোনা পৃথিবীও মুছে,
দেখি,
জানালায়,
এইসব।
তাতে এইমাত্র এক মরা কদমের জীবন জাহির হইল–
সাথে বরুনের উঁচা মাথায় একটা গোরখোদের ডাক,
মউত ছাড়াও আরো কথা তার থাকতেই পারে
যার জেরে ছায়ার যাওয়া আসা আসা যাওয়া সারারাইত।
এইখানে নিশ্চয়ই একটা সিনেমা চলতাছে
ছোটবেলায় মনে প্রাণে যার অভিনেতা হইতে চাইছিলাম
না পাইরা দর্শক হইছি
এখন মাঝে মাঝে একেকটা সারারাইত
গ্র্যান্ড সার্কেলে বইসা এই সিনেমা দেখি।
থোকবন্দিতে সংস্কৃতির মাল
তোমরা বাইর করছ থোকবন্দি বেচাবিক্রির ফন্দি
ফোর্ট উইলিয়াম মেকলের ছাঁচে কাটা মন
একপাও ইংরেজির, নিউইয়র্ক কিংবা কান-এ
এক পাও আর্যভূম–রামায়ন মহাভারতের
তবু মুখে তোমরাই দেশজ।
মোছ বাপমার দেয়া নাম
মোছ নাম কালের ব্ল্যাকবোর্ডে
দাসের মগজে লেখ নয়া নাম
সংস্কৃত মুখোশে লুকাও নিরর্থক শরমের মুখ।
সঙ্গে লালপাড় শাদা শাড়ি,
আর ধর্মনিরপেক্ষতা বটুয়ায় আনধর্ম চিন্
এইসব তুলে দিয়ে ঠাকুরের বয়োবৃদ্ধ পিঠে
বাটপার প্রগতির চিহ্ন আঁক
থোকে ফেরি কর সংস্কৃতির মাল।
আমরা এই থোকবন্দি মাল নেই না
সেখানে অর্ধেক পঁচা–সা¤্রাজ্যের পুঁজির প্যাকেজ কৌশল
আমরা নিব খুচরা রবীন্দ্রনাথ
সাথে লালপাড় সাদা শাড়ি নাপছন্দ হইতেও পারে
হয়তো তার গানে বাংলার জঙলিছাপার শাড়ি কারো চাই
কিংবা ধরো লালপাড় শাদা শাড়ি–
এ কেবলই আমার মায়ের বা বোনের পোষাক
কেন তারে প্রগতির নিশানা বানাও!
মাটির অফুরান বল, ফসলের বাড়
সন্তানেরা হৃদয়ে লেখে বাংলাদেশ–এই আমার গতি ও প্রগতি।
কষ্টঘামের দিন শেষে যার আনন্দ ধর্মহীন দহলিজে,
কিংবা চায়ের স্টলে, হুক্কায় বিড়িতে আড্ডায়,
যারা চিনেনা তোমাদের মতলবের ধর্মনিরপেক্ষতা
শান্তির ঘুমের আগে একখান লালন, পীরিতি বা বিচ্ছেদী গানে
উড়ে তার জীবননাটক ঠান্ডা হাওয়ার স্বপ্নে পাখনায়।
তোমাদের থোকবন্দির ব্যবসা মুখে আমরার ঘিন্না!
কোনটা নিব কি নিব না
সে আমার বুদ্ধির এখতিয়ার।
নুনের এজেন্ট থেকে সংস্কৃতির দালালের মুখ আমরা চিনে গেছি
বাঙালিয়ানার নামে পঁচা মালের চালান
গছানোর দিন শেষে
ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এম পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। তাঁর অন্যান্য বই: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); এডওয়ার্ড সাইদের কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬); ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১); রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।





Users Today : 0
Users Yesterday : 0
Users Last 7 days : 10
Users Last 30 days : 62
Users This Month : 11
Users This Year : 284
Total Users : 2290
Views Today :
Views Yesterday :
Views Last 7 days : 10
Views Last 30 days : 70
Views This Month : 12
Views This Year : 339
Total views : 3189
Who's Online : 0
সুন্দর, উপনিবেশের দাগ আজ ঘা হয়া গেছে।