বৃষ্টির জন্য প্রতীক্ষা

শামসুল কিবরিয়া

আরও চারটি সন্তান থাকলে কী হইবো? এ মেয়েটিও যে তার নাড়ি ছিঁইড়া আইছে তা অস্বীকারের কোনো উপায়  তো নাই।

দিলারা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে বাতাসে। এইটা কী কইরা সম্ভব? তার নাড়ি ছিঁড়া ধন আর তার থাকতো না! এ অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতাকে দিলারার মন মাইনা নিতে চায় না।

অথচ এ সন্তানটিকে দত্তক দিতে তারও সম্মতি আছিলো। চারটিকে লালন-পালন করাই কঠিন ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইছে। ভালা খাবার-দাবার না পাওয়ার কারণে কোনোটারই স্বাস্থ্যের অবস্থা ভালা না। চারটি মেয়ের পর পঞ্চমটিও যে  মেয়ে হইবো কে জানতো? মূলত একটি ছেলের আশাতেই তারা এ সন্তানটি নিছিলো।

মোটে পাঁচ মাস বয়স হইলো মেয়েটার। দিলারা দুধ খাওয়াইতে খাওয়াইতে তার মাথায় হাত বুলায়, গায়ে হাত বুলায়। নরম তুলতুলে গা’টা হাতাইতে কতো আরাম লাগতাছে। আর  কয়দিন পরেই বুকের দুধের পাশাপাশি বাড়তি খাওন দিতে হইতো। এজন্য বাড়তি একটা আয়োজন লাগতো। তাদের সাধ্যমতো খাওন দিতো হয়তো। অন্যদের বেলায় এইভাবে চিন্তা করতে হয়নি কিন্তু তার ক্ষেত্রে চিন্তা করতে না চাইলেও চিন্তা আইসাযায়। খাওন তো আর এমনি এমনি ঘরেআয় না। ভালাভাবে খাওয়াইতে না পারলে এখন যে নরম তুলতুলে লাগতাছে শরীরটা তখন এইরকম লাগতো না। হয়তো হাড্ডি হাতে লাইগা যাইতো, চোখ দুইটা কোঠর থাইকা বারইয়া আইতো আর দেখতে বড়ো লাগতো। দিলারা মেয়ের ডান হাত তুলে চুমা খায়। আর মাত্র দুইদিন তারে পাইব। এরপরে এইভাবে আর তারে চুমা খাওয়া হইবো না। তারে আর বুকের দুধ খাওয়ানো হইবো না,তারে কাঁধে তুইলা ঘুম পাড়ানো হইবো না।  মেয়ের কান্না ও অর্থহীন শব্দগুলা শোনা হইবো না। অন্য  মেয়েরার হাসি, কান্না, অভিমানÑ সবকিছু তো পূর্ণভাবে পাইছে। তবু এ মাইয়টার লাগি কেমন একটা শূন্যতার বোধ তৈরি হয়। তাকে ছাইড়া যে সে দূরে  চইলা যাবে অন্য কারো মেয়ে হইয়া বড় হইবো এটা এখন আর মন মাইনা নিতে পারতাছে না।

দিলারা তার স্বামীকে ডাইকা বলেÑ মেয়েটারে ছাড়তে ইচ্ছা অইতাছে না। মনটা একবারেই চাইতাছে না। পুরাপুরি না ঘুমাইলেও দিলারার স্বামীর চোখ ঘুমে আচ্ছন্ন হইয়া আছে। এর প্রভাব থাকে কণ্ঠেও। ঘুমজড়ানো কণ্ঠেই সে বলেÑআমরা তো চিন্তা-ভাবনা কইর‌্যাই এরে দিয়া দিতাছি। অইন্য ঘরে গেলে তো ভালা খাইতে পারবো, পড়াশোনা করতে পারবো।

Ñসবই ঠিক আছে। আমার মাইয়্যাটারে আর কোনোদিন পাইতাম না। হে-ও আমারে পাইতো না, তোমারে আমারে মা বাপ বইল্যা চিনতো না। এইটা মানি কেমনে? আগে এমন কইর‌্যা ভাবি নাই।

Ñআমরার মাইয়্যা যদি ভালা থাকে তাইলে কী আমরার ভালো লাগতো না। তাছাড়া তারার সাথে তো কথা আছে আমরা যেন মাঝে মাঝে তারে দেখতে পাই।

Ñএইটা কথার কথা। দেখলেও মনে অইবো এখন সে আরেকজনের মাইয়া।

Ñ এমন কথা এখন আর কইয়্যা লাভ নাই। কথা তো দিছিই, কাগজপত্রেও তো সই দিয়া দিছি।

কিন্তু দিলারার ঘুম আসে না। গতরাতও প্রায় ঘুমহীন কাটছে। সংসারের কাজগুলা করতে গিয়াও আলস্য আইসা ভিড় করে মনে।শরীর চলতে চায় না। তবু ঠেইলা নিয়া যাইতে হয়। আর ছোটো মেয়েটারে কোলে নিয়া বইসা থাকতে ইচ্ছা হয়। এতো মায়া, এতো বন্ধন! এগুলা উপেক্ষা করে চইলাযাবে মাইয়াটা?

রাত আরও কিছুদূর আগাইয়া যায়। শরীর ঝিমাইয়ে পড়তাছে একটু আগে থাইকা। এখন চোখও একটু একটু মুইজা আসতাছে দিলারার। কিন্তু  মেয়ের কথা মনে আসলেই আবার ঘুম চইলা যায়। যখন মেয়েরে দত্তক দেয়ার ব্যাপারে চূড়ান্ত কথাবার্তা হয় তখনও তার এতোটা খারাপ লাগেনি, এখন যেমন লাগতাছে। তখন কী তাইলে নিজেদের দারিদ্রের কবল থেকে মুক্ত হয়ে মেয়েটি যে একটা ভালা ভবিষ্যৎ পাইবো এই আশাতেই মন আচ্ছন্ন হয়াছিলো যার জইন্য মাতৃত্বের  শক্ত বাঁধনটার কথা আর মনে আসেনাই? কিন্তু এ টান  যে কোনোমতেই এড়ানো যায় না, যা এখন সে খুব ভালা কইরা টের পাইতাছে। চারটা মেয়েকে পালতে পারলে এ মেয়েটারে পালতে পারতো না কেন? মানুষের কী আর এমন কইরা সন্তান নাই? আশেপাশেই তো আছে। তারা কী সন্তান পালতাছে না? এখন নিজেরে এমন প্রশ্নবাণে জর্জরিত করলেও তখন তো মাথায় আইছিলো মেয়ের বাবার আগের মতো কাজ করতে না পারার বিষয়টি। গতর খাটানোর কাজ করে। গতর ভালাভাবে না খাটাইতে পারলে টাকা আইবো কই থিকা? গতর পুরা খাটিয়েই যা পায় তাতে কইরা টাইনাটুইনা চলে। আর এখন আয় কইমা যাওয়ায় টানাটানির পরিমাণ আরও বাইড়া গেছে। তাই বড় মেয়েরে দিছিলো শহরে এক বাসায় কাজ করতে। কিন্তু সেখানকার কাজের চাপে সে আর টিকতে পাওে নাই। পরে আরেক বাসায় দিতে চাইলে মেয়ে আর যাইতে চায় নাই। সে বলে, বাড়ি ছাইড়া কোথাও যাইতো না। এরপর মেঝু মেয়েরে দিছিলো এক বাসায়। সেও দুইদিন থাইকা কান্নাকাটি শুরু কইরা দেয়। পরে  মেয়ের বাপ তাকে নিয়া আসে। তাই দত্তক নিতে আগ্রহী এক নিঃসন্তান দম্পতির সাথে একজনের মাধ্যমে যোগাযোগ হইলে দুইটা ভালা খাওয়া, ভালা থাকার ব্যবস্থা মাথায় আইলে আর এর সাথে কিছু টাকাও পাওয়া যাইবো এই ভাইবা মনরে শক্ত কইরা তাতে সায় দেয়। এরপর দৃশ্যমান কান্না তো আছিলোই, ভেতরের অদৃশ্য অন্তহীন কান্না নীরবে বইয়া চলে, চলতাছে এখনও।

আর মাত্র দুইটা দিন মেয়েটারে কাছে পাবে। তাকে রাইখা ঘুমায়  কেমনে? দিলারার চোখ তাই ঘুমে ভারী হইয়া আইলেও পুনরায় পাতলা হইয়া যায়। অল্পালোকিত ঘরে নজর থাইমা যায় কেবল মেয়ের মুখে। মেয়ের উপর চোখ গাঁঁইথা ফেলে যেন এমনভাবে দেইখা নিতে চায় যাতে আজীবন স্পষ্ট হইয়া এ চেহারাটা চোখের সামনে উজ্জ্বল হইয়া ফুইটা থাকে।

মেয়ে কান্না শুরু করলে দিলারা স্তন মুখে পুইড়া দেয়। এর আগে বাতিটি নিভায়ে দেয়, দুধ খাওয়াইতে খাওয়াইতে যদি ঘুম আইসা যায় এই আশায়। না ঘুমাইলে তো শরীর চলতো না, শরীর না চললে কাজ করা যাইতো না। তৈয়ব আলীর বাড়িতে ধান তোলার কাজ পাইছে। এতো পরিশ্রমের কাজ করতে তো শরীরও ঠিক রাখা লাগে। ঘুম কম হইলে এমনিতেই শরীর ম্যাজম্যাজ করে এর উপর যদি একবারেই না আসে তাইলে তো চলতেই পারবে না।

একটা রাতজাগা পাখি ডাইকা উঠতাছে মাঝে মাঝে। এ ডাক রাতের স্তব্ধতা ছিইড়া ফেলতাছে। দিলারা পাখির ডাক শুইনা শিউড়ে ওঠে। কোনো অমঙ্গলের বার্তা নয়তো?  মেয়েটি ঐখানে গিয়া কী কোনো বিপদে পড়বে? মেয়েটারে আরও ভালা কইরা জড়াইয়া ধরে বুকে। আগেও তো রাতে এইভাবে পাখি ডাকছে, প্রায়ই ডাকেÑ এমন তো মনে হয়নি কখনো। এখন তাইলে এমন হইতাছে ক্যান? দিলারা মনের সাথে বেশ সময় যুদ্ধ করার পরস্বামীকে ডাইকা তুলে।  সে খুব কষ্ট করে  চোখ খুইলা বলেÑএতো রাইতে ডাকলা কেনে?

Ñঘুম আইতাছে না। মাইয়্যাটারে দিতে মন চাইতাছে না।

Ñএকটু আগেও তোমারে বুঝাইলাম। এখন আবার জাগাইয়্যা এক কথাই কইতাছ। তোমার কী অইছে কও? মাইয়্যারে  দিয়া দিমু আমার কী খারাপ লাগতাছে না?

দিলারা আর কিছু বলতে পারে না। মুখ যেন পাথর হইয়া গেছে। তাই চুপচাপ বইসা থাকে কেবল। একসময় রাতের নিস্তব্ধতা ভাইঙ্গা তার স্বামীই বলেÑ তার ভালার জইন্যই তো আমরা এই কাম করতাছি। সংসারটা যদি চালাইতে পারতাম তাইলে তো আর এমন চিন্তা করি না।

দিলারা এবার কাইন্দা ওঠে। রাতের নির্জনতায় অল্পসুরের কান্নাটারেই বেশি আওয়াজ বইলা মনে হয়। সকালে কাজে যাওয়ার তাড়া আছে বলে স্বামী আর তাকে সঙ্গ দিতে চায় না, বলেÑ‘ঘুমাইয়া যাও। আল্লা যা করে  ভালার জইন্যই করে।’

সে ঘুমাইয়া পড়লে দিলারা আরও কিছু সময় ফুঁপাইয়া ফুঁপাইয়া কান্দার পর শান্ত হয়। পরে এ বিষয়টা মাথায় আইলে তার ভালা লাগে যে, মেয়েটা তার কোল খালি কইরা গেলেও অইন্য আরেকজনের কোল তো ভইরা দিতাছে। একটা সন্তানও যার নাই তার জন্য কী এটা খুব আনন্দের  বিষয় না? সকালে তারেও কাজে যাইতে হইবো বলে ঘুমানোর চেষ্টায় এবার চোখ মুজে।

আর মাত্র দুইটা দিন অপেক্ষা করতে হবে। অপেক্ষা তো সে কবে থাইকাই করতাছে। একটি সন্তানের জন্য কতো অপেক্ষা করছে! কিন্তু এই অপেক্ষার শেষে কিছু পাওয়া যায়নি। এখন তার ঘরে একটা শিশু আাইবো। যদিও নিজের গর্ভজাত নয়, তবু একটি শিশু তার হবে, তার ঘরে  শিশুর হাসি-কান্না হবেÑ এ সুখ কল্পনায় সে ভাইসা বেড়াইতাছে। কিন্তু দিন যেন ফুরাইতে চাইতাছে না। অন্তহীন অপেক্ষায় তো কতোদিন কাটছে। এখন আর মাত্র দুইটা দিনকে অনেক দীর্ঘ মনে হইতাছে। তবু অপেক্ষাই করতে হবে। এর আগে শিশুটারেকে পাওয়া যাইতাছে না।

নওরীন শিশুটারে সরাসরি দেখেনি। মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় তোলা ছবিতে দেখছে। তখনই এ শিশুটার  প্রতি যে মায়া জাইগা উঠছিলো তা থেকে যেন বার হইতে পারেনি।তার আনন্দ এমন মাত্রায় পৌঁছাইছে যেন নিজের গর্ভেই এ মেয়েটারে ধরছে। তার মেয়ে হইলে যেন এমনই হইতো। এমন রূপ, এমন শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়াই জন্মাইতো। এ মেয়েটারে তাই নিজের মেয়ে বইলা ভাবতে সে সুখ পাইতাছে, তার আনন্দ হইতাছে।

আজকের রাতটি বৃষ্টিমুখর। নাহিদ তার পাশেই ঘুমাইয়া আছে।কয়েকদিন একটানা তাপদাহ চলার পর আজ ঝুম বৃষ্টি নামলো। এর প্রভাবেই হয়তো নাহিদ খুব আয়েশ কইরা ঘুমাইতাছে। সে ঘুমাইবার আগে তাদের সংসারে আসার অপেক্ষারত মেয়েটারে নিয়ে দুইজনের কথা হইছে। এ সময়ই তারা তার একটা নাম ঠিক কইরা নিছে। মেয়েটার নাম নিয়ে তারা এর আগে চিন্তা করেনি, এর প্রয়োজনও হয়নি। আজ কথা বলতে বলতে নওরীন এক সময় বললো মেয়েটির আমরা একটি নতুন নাম দিবো।

Ñ কিছু ঠিক করলা?

Ñনা, এ নিয়া কিছু ভাবিনি তো আগে। আইচ্ছা, এখন যেহেতু বৃষ্টি হইতাছে আর এখনই আমরা মেয়ের নামকরণ নিয়ে কথা বলতাছি ‘বৃষ্টি’ নাম রাখা যায়।

Ñভালোই হইবো। সুন্দর নাম।

‘বৃষ্টি‘ নামেই অতঃপর সে তাদের কথাবার্তায় আসতে লাগলো।

বহু আকাক্সক্ষার পর যখন বৃষ্টি নামে তখন তো তীব্র শান্তি নাইমা আসে। এই যে তাপদাহ চলার পর বৃষ্টি নামলো কী শান্তিই না এখন লাগছে। তাদেরও তো অনেকদিনের প্রতীক্ষা ছিলো একটি সন্তানের জন্য। ‘বৃষ্টি’ তাদের জন্য শান্তির উৎস হয়ে আসবে। নওরীন এমনই ভাবতাছে এখন।

নওরীন ভাবে, তার মতো অনেকেই থাইকা যায় যারা মাতৃত্বের  স্বাদ উপভোগ করতে পারে না। এ স্বাদের সাথে  নিশ্চয় অন্য কিছুর তুলনা চলে না। সে নিজে এ স্বাদ না পাইলেও কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারে মা’দের দেইখা। আর এ সময়ই তার আক্ষেপ জাইগা ওঠে বেশি কইরা। মনটা বিমর্ষ হইয়া যায়। শূন্যতা কুলকুল করতে থাকে আশেপাশে। এ পর্যন্ত জীবনে অনেককিছুই পাইছে তবু কী যেন নাই এমন মনে হয়।তবু এটা রক্ষা যে সে চাকরি করে। যদি তা না হতো তাইলে যে  কীভাবে সময় কাটতো তা ভাইবা পায় না।

সময়টা তবু মাঝে মাঝে ভীষণ অসহ্য ঠেকে। দুইজনের মাঝখানে নিঃসঙ্গতার সুর বাইজা ওঠে কখনো কখনো। নওরীন শূন্যে তাকায়ে থাইকা আরও গভীর শূন্যতাকে অনুভব করে যেন। দুইজনের মাঝখানে যদি একটি সন্তান শুইয়া থাকতো! ভেতর থেকে উইঠা আসে বেদনার চিকন রেখাÑ কেন আমার ক্ষেত্রেও এমন হলো! কেন আমার কোলজুড়ে কেবলই খা খা শূন্যতা।

বৃষ্টিকে নিয়ে তাই প্রবল উত্তেজনা বিরাজ করছে তার মনে। কী করতাছে বৃষ্টি এখন? নিশ্চয় ঘুমাইয়া আছে তার মায়ের বুক ঘেঁইষা। আর মাত্র দুইটা দিন। তারপর এমন কইরাই বৃষ্টি তার বুকেই ঘুমাইয়া থাকবো । আহ! কী শান্তিই না লাগতাছে এমন কল্পনা করতে। কিন্তু বৃষ্টি কী তখন কান্না করবে খুব পরিচিত বুকের স্পর্শ না পেয়ে। নওরীনকে মা হিসেবে মাইনা নিতে নিশ্চয় তার কিছুদিন সময় লাগবে। এ সময়টুকো কেমন কইরা কাটবে? অফিস থেকে দুই সপ্তাহের ছুটি নেয়া আছে। এ সময়টা সে পুরাপুরি বৃষ্টির জন্য ব্যয় করবে। বৃষ্টির জন্য একজন মহিলাও ঠিক করা আছে। তাদের পাশের গ্রাম থাইকা নিয়াআইছে এ মহিলারে। অর্থাৎ বৃষ্টিকে বরণ করে  নেয়ার সব প্রস্তুতি নেয়া হয়ে গেছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। কখন বৃষ্টি এত তার কোলে শান্তির পরশ বুলায়ে দেবে।

এসব ভাবতে ভাবতে তার মনে পড়ে বৃষ্টির মায়ের কথাও। সে তো নিজের মেয়েটারে দিয়া দিতাছে। হয়তো অভাবের তাড়নাতেই এমন করতাছে। কিন্তু তার বুক কী কান্নায় ভরে  ওঠবে না? মেয়ের জন্য কী তার বুকে কোনো শূন্যতা তৈরি হবে না? যাকে সে দশমাস গর্ভে ধরছে, আরও কয়েকটি সন্তান থাকলেও এর জন্য কী মাঝেমাঝে তার চোখ ভিইজা ওঠবে না?যদিও দত্তক দিতে তারও সম্মতি ছিলো তবু নিজের সন্তানকে কে আসলে দূরে ঠেইলা দিতে চায়? এসব কথা মনে আইলে নওরীনের আনন্দের আতিশয্যে একটু ভাটা পড়ে। এ মহিলার জন্য করুণা বর্ষিত হতে থাকে তার মনে। বেচারী, আর মাত্র দুইটা দিন কাছে পাইবো মেয়েরে। যখন  মেয়েটাকে তাদের হাতে তুইলে দিবে তখন কি হবে তার মনের অবস্থা?নাহ, এটা ভাবা যায় নাÑনওরীন নিজেরে বলে।

ঘুম আসতাছে না। অবশ্য খারাপও লাগতাছে না এজন্য। কী এক ঘোরের ভেতর যেন সে ঢুইকা গেছে। একবার উইঠা বারান্দায় গিয়া খাড়ায়। নিজের হাতে লাগানো টবের ফুলগাছগুলা দেখে মোবাইলের টর্চ জ্বালাইয়া। কয়েকটা গাছে ফুল আছে। কয়েকটাতে ফুটবে। কয়েকটা গাছ একবারে খালি। খালি গাছগুলো দেখতে তার ভালা লাগতাছে না। এগুলাতে যেন  দ্রুত ফুল আসে এ আশা করে সে। কাল এগুলাতে আরেকটু যতœ নিবে বলে তৎক্ষণাৎ পরিকল্পনা কইরা ফালায়। তার নিঃসঙ্গ জীবনে ফুলগাছগুলা ভীষণ সঙ্গ দিছে। পরম মমতায় এগুলার যতœ করে সে। গাছ মরে  কোনো টব খালি হয়ে গেলে আরেকটা গাছ আইনা লাগাইতে দেরি করে না। সে শুধু ফুল গাছই লাগায়। ফুলভরা গাছ দেখতেই তার বেশি ভালা লাগে। এখন এই রাইতের আন্ধারে কিছু ফুল চুপসে আছে। সকালে রোদ পাইলেই এগুলা তরতাজা হয়ে ওঠবে। রোদের হাসিতে এরাও হাসবে। যারা ফুলের বাগান করে তারা এ হাসি অনুবভ করতে পারে। নওরীনও যেন তার গাছের ফুলগুলোর সাথে নিজেকে মিশায়ে দিতে পারে। এদেরকে খুব নিকটজন বলে তার মনে হয়। তারা পরস্পরের সাথে যে সম্পর্ক রচনা করে তাতে ভাষা থাকে না। কিন্তু এই নীরব সম্পর্ক কখনো কখনো ভাষার চেয়েও শাক্তশালী হইয়া ওঠে । নওরীন রুমে ঢোকার আগে কয়েকটি ফুলে হাত বুলিয়ে দেয়।

নাহিদ খুব আরামে ঘুমাইতাছে। একটি সন্তানের জন্য সে কতোই না কষ্ট করছে। তারে নিয়া অনেক দৌড়াদৌড়ি করছে। প্রথম যে ডাক্তার দেখাইছিলোসে ডাক্তারই বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা কইরা বলছিলো সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। আর এ সমস্যাটা নওরীনেরই। তবু ক্ষীণ আশা নিয়া তারা ডাক্তার বদল করছে। একইরকম কথা শুইনা চইলা গেছে অন্য ডাক্তারের কাছে। এরকম কয়েকবছর চলার পর কিছু সুহƒদেরপরামর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতে গেছে চিকিৎসার জইন্য। দুইজন অফিসে ছুটি ম্যানেজ কইরা বেশদিন ভারতের এক ডাক্তারের অধীনে চিকিৎসা নিছে। এ উদ্দেশ্যে বেশ অর্থও ব্যয় হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো কাজ হয়নি। ভারত থেকে যখন সব আশা ভরসা শেষ কইরা দেশে ফিইরা আসে তখন নওরীনের এক খালার পরামর্শেই, যদিও নওরীন এবং নাহিদ এ ব্যাপারে কোনো ভরসা করে না, তবু তারা এক হুজুরের পরামর্শ নেয়Ñযদি কিছু হয় শুধু এই আশায়। বলা তো যায় না কী থেকে কী হয়। ফলে সে গোপনে তাবিজ পড়েও পানিপড়া খায় নিয়ম করে। বছরখানেক এভাবে চলার পর কোনো কাজ না হলে তারা সব আশাই ছাইড়া দেয়। নাহিদ বলেÑঅযথা আর কষ্ট করার দরকার নাই। আমাদের ভাগ্যে সন্তান নাই ।

নাহিদের কথায় যে দীর্ঘশ্বাস মেশানো থাকে তা নওরীনকে বিদীর্ণ করে। একটি সন্তানের জন্য হাহাকার আরও তীব্রভাবে বাইজা ওঠে। তার চোখ বাইয়া আলগোছে পানি ঝরে। অনেকদিনই এভাবে পানি ঝরেছে। এর কোনও সমাধান নাই জাইনাও মন যেন  মাইনা নিতে চায় না। মন কী কখনো কখনো এভাবে যুক্তিবোধের বাইরে চইলা যায়? অকাট্য যুক্তি হারাইয়া যায় আবেগের তলে।

এক ছুটির দিনের বিকালে চা খাইতে খাইতে হঠাৎ কইরাই নওরীনের মাথায় একটি সন্তান দত্তক নেয়ার কথা চিন্তা আসে। পাশে বসা নাহিদকে বলেÑ নিজের সন্তান তো আর হইতাছে না। একটি বাচ্চা দত্তক আনা যায় কি না?

Ñকি বলো!

Ñহ্যাঁ, দেখো চিন্তা কইরা। শূন্যতার চেয়ে তা-ই কী  ভালা না।

Ñতা ভালা। কিন্তু কই পাবো? এজন্য তো কোনো প্রস্তুতিও নেই।

Ñচেষ্টা  করলে পাওয়া যাইতে পারে।

নাহিদ, বিশেষত নওরীনের দিকটা চিন্তা করেই এ বিষয়টা সিরিয়াসলি নেয়। নওরীন যে কষ্ট পাইতাছে, স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও একটা বেদনাবোধ সে নিরন্তর বয়ে বেড়ায়। নওরীন এটা প্রকাশ না করলেও নাহিদের  নজর এড়ায়ে যায় না। তাই সে খুব ঘনিষ্ঠ দুই তিনজনকে বইলা রাখে দত্তক  নেয়ার বিষয়ে।

এর মাস তিনেক পর এদেরই একজন খবর দেয় যে তাদের এক আত্মীয়ের বাড়ির পাশে একটি পরিবার সন্তান দত্তক দিতে চায়। নাহিদ সাথে সাথে প্রস্তাবটি লুইফা নিয়া নওরীনের সাথে আলাপ করে। নওরীন যেহেতু মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলো তাই সিদ্ধান্ত নিতে বেগ পাইতে হয় না। নিজের গর্ভজাত না হোক একটি সন্তান তার কোলে আসবে এটা ভাইবা সে পুলকিত হয়।

রাত আরও গভীর হইছে। ঘুম আসবে কি না কে জানে? না আসলেও খুব অসুবিধা নাই, কাল যেহেতু অফিস নাই। সকাল সকাল ঘুম থাইকা ওঠতে হবে না। মোবাইলে কিছু সময় কাটনো যাইতো। কিন্তু ইচ্ছা করতাছে না। বরং চুপচাপ বইসা থাইকা ‘বৃষ্টি’র কথা ভাবতে ভালা লাগতাছে। মোবাইলে দেখা বৃষ্টির ছবিটা চোখের সামনে ভাসাইয়া তুইলা সে আরাম পাইতাছে। বৃষ্টির মা বাবার সাথে যেদিন কথা পাকাপাকি হইয়া গেছে সেদিন থাইকাই সে তার অস্তিত্বের সাথে মিইশা গেছে। তাই হয়তো সে আসার দিন যতো ঘনাইয়া আইতাছে তার উদ্বেলতা ততো বাড়তাছে।

আর মাত্র দুইটা দিন। এরপর থেকে বৃষ্টি তার হইয়া যাবে। কাইটা যাবে বৃষ্টির জন্য প্রতীক্ষা।

জহির হাসান

শামসুল কিবরিয়া, কথাশিল্পী, লিটলম্যাগ সম্পাদক; জন্ম ১৯৮৫, হবিগঞ্জ জেলায়। বাবা  আব্দুল মালেক চৌধুরী, মা আনোয়ারা খাতুন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ- বৃত্তাবদ্ধ জীবনের প্রতিবিম্ব,(২০১৯, চারবাক), কতিপয় স্মৃতির আর্তনাদ (২০২১, বেহুলা বাংলা)। সম্পাদিত পত্রিকা বইকথা

1 comment

  1. শুভকামনা, কিবরিয়া। বাঙালমেলে মান কথ্যবাংলায় লেখা প্রথম প্রকাশিত গল্পের স্রষ্টা হিসাবে আপনাকে সাধুবাদ এবং আগামী দিনের জন্য অফুরান আশাবাদ।

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।