জহির হাসানের ৫টি কবিতা

নাটক দেখতে আসি

সমুদ্র তীরে আজ দুইজনে পাশাপাশি থিয়েটার দেখতি আসছি, পাশাপাশি বসি নাটক দেখতেছি, অভিনয় দেখতেছি,
কুশীলব কত পাকা তারা নিজেরে লুকাইতে জানে চরিত্রের বাঁকে আড়ে আড়ালে,
তারা নিজের হাসিটি ফেলে অন্যের হাসি হাসতেছে, তারা নিজের কান্দনটি রাখি অপরের কান্নাটি
কানতেছে, তারা নাচতেছে তারা কুদতেছে, তাদের সাথে সাথে আমরাও কী কিছু কিছু অভিনীত
হতেছি কী! নইলে আমরাও হাসতেছে কেন , কেন ক্রোধ ধরতেছে, কেন প্রেমের দৃশ্যে গলি পড়তেছি,
অভিনয় দেখতে আসলে এরকম হয় কেনে, মঞ্চের বিপরীতে সব দর্শকদের জোর করি বাস্তব থাকা লাগে, তাই যতবারই আমি থিয়েটারে গেছি আমি তোমার হাত শক্ত করি ধরি রাখছি, আর কইছি চোখ বুজি থাকো আফসানা, আমরা যেন নাটকের দৃশ্যের মতো মিথ্যা না হই যাই, তাই কোনোদিনই আমরা একসাথে থিয়েটারে আসি নাটক দেখি নাই, সমুদ্র, সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন, ঝাউয়ের শোঁ শোঁ শব্দ, শঙ্খচিলের উড়া যেমন সত্য ও বাস্তব তারা যেমন
অভিনয় ন, তোমারে সেইরূপ বাস্তব ভাবতে চাই আমি, পরে তুমি স্বপ্ন, থিয়েটার নাটকের কোনো চরিত্র ন, চোখ বুজি থাকো আফসানা,
আমাদের নাটক দেখতে আসার আগে এইটা বার বার ভুলি যাই কেনে, আফসানা!

আবছায়ার তলে

লতাবৎ তোমার গ্রীবাহেতু
বিল্ববনের আলো-ছায়া লড়ে
দেহলতা আড়ে কয়টা ঘোড়া গাড়ি সমেত চিরতরে লুপ্ত হয়
ভাসে মুহুর্মহু রচে দৃশ্য প্রমাদ
উড়লে পাখি ভার্জিন হইতে আসে আকাশ
আমার মওতের সাথে তুমি মরো
মোর জন্মের লগে লগে
তুমি জন্মাও
ক্ষণিকত্ব বহনে আমি অক্ষম
নদীর এইপাড়ে চোখের তারার মতো
সেতু কাঁপে
তোমার কাপড় আমারে পরায়ে দাও
তোমার দেহলতা আমারে পরায়ে দাও
নিজেরে ফালায়ে মোরে আফসানা কই ডাকো
একবার রাতে একবার বিহানে
একবার কুয়াশায়
একবার শিশির বেলায়
তুমি কইলে চিরকাল বিহনে
আমিও কইলাম চিরকাল বিহনে!

অকারণ নামের পাহাড়ে

সকল অস্থির রজনীর কারণ তুমি!
আমি যখন পাহাড়ে যাই শুই রই
একখান পাথরের পর যেইখানে
বুনা হৃদয়ের কেউ অমরতার লোভে পড়ি
লিখি রাখে নাই কিছু অদ্যাবধি!
এইখানে মেঘচ্যুত সৌদামিনী চুপিসারে
আমার পাশে ঝরি শুই পড়ে বাদুড়ে খাওয়া
পাকা জামরুলের মতো স্বপ্ন যেন
যেন উঁচা চূড়ায়
চারদিকে দৃশ্য বদলের ছবি দেখতে আমি আসি নাই
একা একা
সকল মত্ততা কে যেন আসি কাড়ি লই গেছে এইখানে
তোমার চোখের রঙ ঢালো আমার চোখে
দেখি তারা নিচে নামে কিনা !
সেই নিচরে সত্তার গহন নামে ডাক দিলে উত্তর দেয় কিনা
দেখি এইটা গল্প নাকি কোনো জীবন
দেখি মওত জেরা করে কিনা
দেখি প্রেম আর শূন্য
বুকরে কে বেশি ছেদা করি গেছে
দেখি আর কে কে কান্দে শরমিন্দা পেঁচা ছাড়া
লুকাই লুকাই এই আন্ধারে!
দেখি
সকল অস্থির রজনীর কারণ তুমি
আর কয় কয়বার উচ্চারণ করা যায়!

তোমার বয়ান

আচমকা বৃষ্টির মতো জীবনে তোমার
আইলো প্রেম,
সবকিছু পাল্টাই দিল ভাঙলো সব কঠিন বস্তু
নাস্তির নাচনে!
যা স্বদেশি মাটির মতো নরম
টিকি রইল
নানা দশা
বিরহী পথ দেখাইলো
প্রবৃত্তি ও আত্মা গৌরব হারাইলো
একটা কদমফুলের রোম কানখাড়া করি রইলো
আরেকটা বর্ষার অপেক্ষায়
কল্পনায় যত মরুভূমি ছিল
তারা অমরতার কাছে জমা রাখে
অমুছা পায়ের ছাপ
তলানিটুকু লিখা হইল সত্তা রঙধনু দি
একটা ঝরা ফুল গাছেরে বেশি বেশি নিয়ন্ত্রণ করতে থাকলো
ডুবাজাহাজগুলা জাগি না উঠল অহম ফাটাইতে
একটা জঙ্গল নিজ গায়ে আগুন লাগাই
উন্মাদের মতো নাচতে থাকলো দূরে
পাগলামিই শেষ ভরসা
ভায়োলিন শুনতে আসলো যারা
তারা ভোরের শিশির
আকাশ
ঝর্নার ভিতর হরিণের ছায়ার সই হইল
আচমকা বৃষ্টির মতো জীবনে তোমার
আইলো প্রেম যেই
সবই নতুন সাজে সাজলো!
শুধু তুমিই অদৃশ্য রইলা!

আমির বিবরণ

ভোর হইল। দেহের বিছানা ছাড়ি
আত্মা আমার জানালারে টা টা দিল !
মড়া নিজেরে ’আমি’ দাবি করি
বসে যদি শেষে!
তাড়াতাড়ি ভাগি
নারকেল গাছের উপর দিই
দেবদারুর তল দিই
পুকুরে হাঁসের দলের সাদা-হলুদ রঙ অবহেলি
মড়া নিজেরে ’আমি’ দাবি
করি বসে যদি শেষে!

জহির হাসান

জহির হাসান

কবি, প্রাবন্ধিক ও চিত্রশিল্পী । জন্ম ২১ নভেম্বর ১৯৬৯, যশোর জেলার পাইকদিয়া গ্রামে মাতুলালয়ে। পিতা-মো. সহিদুল হইসলাম, মাতা-সুফিয়া খাতুন। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে যশোর ও ঝিনাইদহের গ্রামে। লেখালেখির শুরু ৬ষ্ঠ শ্রেণি। প্রথম কবিতা প্রকাশ ১৯৮৪ সালে যশোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক স্ফূলিঙ্গ পত্রিকায়। এ যাবত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৪। গোস্তের দোকানে , ওশে ভেজা পেঁচা, পাতাবাহারের বৃষ্টিদিন, আয়না বিষয়ে মুখবন্ধ, আম্মার হাঁসগুলি, বউ কয় দেখি দেখি, বকুলগাছের নিচে তুমি হাসছিলা, আমি ও জহির প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। আগ্রহ ধর্ম, ভাষা, দর্শন ও চিত্রকলায়। পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে।

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।