ফয়েজ আলম
ভাষার সাথে সংস্কৃতির সম্পর্ক কি রকম? নৃতাত্ত্বিক বিবেচনার বাইরেও কি এই সম্পর্কের কোন পরিসর রয়ে গেছে যা আজও আমাদের চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেনি?একে অপরের প্রভাবে কি বদলে যেতে পারে সংস্কৃতি ও ভাষার রোখ? এমনকি চিন্তার অন্যান্য ক্ষেত্র–যেমন ইতিহাস, সমাজবিদ্যা, ধর্ম সেখানেও ভাষা কি প্রভাব রাখতে পারে না? এইসব সূত্র ধরে ভাবলে আমরা ভাষার ক্ষমতার এমন নানামুখি তৎপরতার দেখা পেতে পারি আগে যা আমাদের নজরে আসে নাই।
নৃতাত্ত্বিকদের মতে সংস্কৃতি একটি নির্দিষ্ট সমাজের শামিল মানুষের তাবত আচরণের সমষ্টি। আচরণ বলতে বসবাস, খাওয়া-দাওয়া, পরস্পরের সাথে লেনদেন ও যোগাযোগ করা, আনন্দ করা সকলই বুঝায়। এই কাজগুলো নিজেরা সংস্কৃতি না, এগুলোর ধরণটাই সংস্কৃতি। কি খাচ্ছে, কোন সময়, কিভাবে খাচ্ছে, বসবাসের ধরণ কেমন এইসব সংস্কৃতির বিষয়। এরকম ধারণায় ভাষা সংস্কৃতির অংশ মাত্র, সংস্কৃতির অনেকগুলা জিনিষের একটা। মানুষ সংস্কৃতির আর সব উপাদানের মত ভাষাও রপ্ত করে, জন্মের পর স্বাভাবিক শিখনের কায়দাতেই।
সাধারণ অর্থে সকল জীবজন্তুর বেলায় শিখার এই কায়দা সরল। তাদের সংস্কৃতি খুব ধীরে বদলায়; এমনকি কয়েকশ বা হাজার বছরেও পরিবর্তন আসে না, যদি না মানুষের কোন কোন আচরণ অনুকরণের কারনে রদবদল না ঘটে। তাদের বেলায় এই বদলের নিয়ামক হলো আত্মরক্ষামূলক চিন্তা। পরিবেশ পাল্টে গেলে পাল্টানো পরিবেশে আত্মরক্ষার প্রয়োজনে জন্তুর আচরণও পাল্টায়, খ্যাদ্যাভাসে পরিবর্তন আসে। বদলায় বসবাসের ধরণও। এইসব ধরণ তাদের ছেলেপিলে ও নাতি-নাতকরদের মধ্যে জায়গা করে নেয় মুখ্যত শরীরি কায়দা অনুকরণের মধ্য দিয়ে। জন্তুর বাচ্চারা এগুলো শিখে নেয় মা-বাবার শরীরি আচরণ দেখে।
প্রাগৈতিহাসিক কালেরও আগে যখন আরসব প্রাণীর মত মানুষেরও তৎপরতা মুখ্যত সরল প্রক্রিয়ায় খাদ্য গ্রহণ আর বংশবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তখন হয়তো মানুষের সাংস্কৃতিক শিক্ষনের প্রক্রিয়া এমন সরল ছিল। কিন্তু উন্নত শিকার কৌশল, গোত্রভিত্তিক জীবন যাপন আর ভাব বিনিময়ের উন্নত মাধ্যম বিশেষত ভাষা রপ্ত করার পর তার শিখনের প্রক্রিয়া অন্যসব প্রাণীর তুলনায় বদলে যায় আর দ্রুততর হয়। বদলের কারণ ও কায়দাগুলোও নানা রকম আর জটিল হয়ে উঠে। এরপর গোত্র ও গ্রামকেন্দ্রিক জীবনে দলবান্ধা মনোরঞ্জন, মেলবদ্ধতা, মেলের সাংস্কৃতিক আচরণে মিল রাখা ইত্যাদি অভ্যাস সৃষ্টি হয়। আর তখনই সংস্কৃতির সামাজিক মর্যাদাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে; এক সময় যা ছিল শুধু গোত্রগত মান্যতার বিষয়, তখন তা যুক্ত হয় মানুষের ব্যক্তিক অর্জনের তালিকায়। নির্দিষ্ট এক বা একাধিক সাংস্কৃতিক আচরণকারী ব্যক্তিকে সমীহ করার রেওয়াজ তৈয়ার হয় গ্রামসমাজে। সংস্কৃতি হয়ে উঠে কিছুটা সচেতনে আয়ত্ত করার ব্যাপার। তবু আধুনিক সময়ের তুলনায় সে কালের শিখনের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম জটিল পথে এগিয়েছে।
নগরায়নের আগে সংস্কৃতি ছিল জন্মগত আর পরিবার ও সামাজিক নির্দেশনার সূত্রে খানিকটা অসচেতনভাবে খানিকটা সচেতন প্রয়াসে অভ্যাসে নিয়ে আসার বিষয়। নগরায়ানের পর ব্যাপকভাবে বাড়ে মানুষের স্থানান্তর। কাজের সূত্রে ও অন্যান্য কারণে মানুষ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বসত শুরু করে, যার অর্থ সে এক সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতিতে অভিবাসন করে। একই জাতির আবাসগত ভৌগলিক সীমানায় তা ঘটলে সংস্কৃতির পার্থক্য খুব বেশি হয় না, তবে ভিন্নতা একেবারে কমও নয়। এভাবে নগরায়নের সূত্রে সংস্কৃতি আর অসচেতনভাবে অভ্যাসের বিষয় হয়ে থাকে না, হয়ে উঠে সচতেন অনুকরণ ও আয়ত্তের বিষয়। অন্যদিকে, নগরায়নের মধ্য দিয়ে মানুষ তার জীবন যাপনে আরাম আয়াশ বাড়ানোর কাজে বিশেষ নজর দেয়, সামান্য প্রয়োজনে কখনো বা অপ্রয়োজনে পণ্য ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ে। আরো নিবিড় হয় সংস্কৃতির সাথে সামাজিক মর্যাদার মাত্রাগত সম্পর্ক। নতুন একদল লোক একটা নতুন সাংস্কৃতিক পরিবেশে এসে বসত করে সামাজিক মর্যাদায় উঠতে চাইলে সংস্কৃতি হয়ে উঠে তার মূল অবলম্বনগুলার একটা। এ পর্যায়ে সংস্কৃতির সামাজিক উপাদানসমূহ যেমন, পোষাক আশাক, সাজসজ্জা, ভাষা, অর্থাৎ ঘর ও পরিবারের বাইরে ব্যক্তিক মর্যাদার সাথে জড়িত উপাদানগুলির গুরুত্ব আলাদাভাবে নির্ধারিত হয়। সংস্কৃতির সামাজিক উপাদানগুলো পরিণত হয় সচেতন সুসংগঠিত শিক্ষা ও আর্থিক ব্যয়ের মাধ্যমে অর্জনের বিষয়।
এই শিক্ষার বেশিরভাগটাই সম্পন্ন হয় ভাষিক নির্দেশনার মাধ্যমে। আর তার চেয়েও বড় কথা, শিক্ষার কায়দাকানুন আর ইতিহাস, তার নথি ও বিবরণ জমানোর প্রয়োজন হয় বাচ্চাদের ও বাচ্চার বাচ্চাদের জন্য। জমানোর জায়গা হলো প্রথমে বংশের ও সমাজের সিলসিলাতে মুখের ভাষায়, আর, লেখা আবিষ্কারের পরে লিখিত ভাষায়। ভাষা পরিণত হয় সমাজের সামগ্রিক সংস্কৃতির বিরাট এক পোটলায়, যেখান থেকে ব্যবহারিক প্রয়োজনে সংস্কৃতির সাথে মানুষের লেনাদেনা চলে। সংস্কৃতি বদলালে ভাষার পোটলায় তার নথিও বদলায়। আবার এই নথি পাঠে মানুষ তার সাংস্কৃতিক আচরণে প্রয়োজনীয় শুদ্ধিও আনে।
ভাষার এই নয়া ক্ষমতার কারণে তা কেবল সংস্কৃতির অংশমাত্র হয়ে থাকে না, হয়ে উঠে সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। এর ফলে ভাষার পোটলায় সংস্কৃতি ধারণ ও বহনের সময় তার লিখিত নথি বদলে সংস্কৃতির ব্যবহারিক জায়গাটায়ও কৃত্রিম পরিবর্তন নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হয়। ক্ষমতাধর কেউ চাইলে ভাষার জগতে সঞ্চিত সংস্কৃতির বয়ান পরিবর্তন করে দিতে পারে। ফলে পরের প্রজন্মের মানুষেরা পাবে সংস্কৃতির পরিবর্তিত বয়ান। এ থেকে সে যা শিখবে তার সাথে পূর্বপুরুষের প্রকৃত সংস্কৃতের মিল থাকবে না, বরং ভাষার বয়ানের মধ্যে পরিবর্তিত সাংস্কৃতিক ধরনের সাথে সাদৃশ্য থাকবে। ধরা যাক কোনো একটা আধুনিক জনগোষ্ঠীতে জারিগান একটা সার্বজনীন সাংস্কৃতিক চর্চা হিসাবে বংশপরম্পরায় চর্চিত হয়ে আসছে। এ ইতিহাস লেখা থাকবে তাদের ভাষায়। কোনো একটি বহিরাগত শক্তি বা আভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী যদি প্রকৃত ভাষিক বয়ান মুছে দিয়ে জারিগানকে একটি সাম্প্রদায়িক আচরণ হিসাবে বিবৃত করে নতুন বয়ান যুক্ত করে দিতে পারে তাহলে দুএক প্রজন্ম পরে জারিগান সেই মানবগোষ্ঠীর কাছে সাম্প্রদায়িক আচরণ হিসাবেই গণ্য হবে। এ অবস্থাটা সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের বড় একটা উপাদান। উপনিবেশী শক্তি তার যথেচ্ছা ব্যবহার করেছে, ভাষিক বিবরণে স্থানীয়দের সংস্কৃতির ইতিহাস পাল্টেছে, তার উৎস ও পরিচয়ে জুড়ে দিয়েছে নি¤œ-মানের কলঙ্ক; নিজেদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে সভ্যতা, উন্নতি ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসাবে। এমনকি এখনো রাজনৈতিক মতভেদ বা ভৌগলিক ব্যবধানের কারণে এ ধরণের ভাষিক ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনা ঘটে চলেছে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।
আমরা যেমন বলি মানুষ সামাজিক জীব, তেমনি বলা যায় মানুষ ভাষিক জীবও। জন্মগতভাবে বধির মানুষ ছাড়া ভাষার বাইরে চিন্তা, কল্পনা, স্বপ্ন ইত্যাদিও সম্ভব নয়। সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরার জন্যও ভাষার সাহায্য নিতে হয়। আধুনিক শিক্ষিত মানুষের সংস্কৃতি, ইতিহাস, জ্ঞান, ভাববজগত সবই ভাষার কাছে বান্ধা পড়ে আছে, যার অনেখানি আবার লিখিত ভাষা। যারা পড়তে জানেন না তারাও শিক্ষিত জনের পড়া ও প্রচারের মধ্য দিয়ে প্রভাবিত হন ঐ ভাষার দ্বারা। কাজেই বলা যায় “আধুনিক সামাজিক মানুষ কেবল মাটির আশ্রয়ে বাঁচে না, ভাষার মধ্যেও বাঁচে, ভাষার মধ্যে সে মানুষ হয়ে ওঠে। সংস্কৃতি বলতে যা বোঝায় তার মূর্তির অনেকটাই ভাষা দিয়ে বানানো। মানুষের আত্ম-চেতনা বা আমিত্বের বোধের বেশিরভাগটাই ভাষার আশ্রয়ে তৈরি। যে-প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশে মানুষের বড়-হওয়া সেই পরিবেশকে সে চৈতন্যে ধারণ করে ভাষার সাহায্যে চিনে নিয়ে।” এই ভাষার বেশিরভাগটাই লিখিত (বা অডিও রেকর্ডকৃত)–বই, পত্রপত্রিকা, চিঠি, আজকালকার কথিত-নথি (অডিও ফাইল) ইত্যাদি। এইভাবে দেখলে আমরা বুঝতে পারি আধুনিক মানুষের জানার জগতটা আসলে কিতাবের জ্ঞান, বয়ানের পাঠ। অতএব কোনো পরিস্থিতিতে যদি একটা জনগোষ্ঠীর ভাষা বদলে যায় বা প্রচলিত ভাষার বানোয়াট রূপান্তর ঘটে তাহলে ব্যাপক পরিবর্তন আসে তার জানার জগতে। নতুন ভাষা বা রূপান্তরিত ভাষায় যেসব বইপত্র রচিত হবে তারা দিন দিন সেগুলোর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। পুরানা বইপত্র আস্তে আস্তে তাদের জানার দুনিয়ার বাইরে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে, সেই সঙ্গে তারা হারাবে তাদের মনোজগতের অনেক কিছুই: সংস্কৃতির বয়ান, ইতিহাস, ধর্ম সম্পর্কিত বিবৃতি, সমাজ ও সাহিত্য অনেক কিছু। তাদের মনোজগতে স্থান করে নিবে ভাষার নতুন ধরণে রচিত বইপত্রের মাধ্যমে উপস্থাপিত নতুন জগতের নানা উপাদান। উপনিবেশী শাসকরা এভাবেই শিক্ষাদানের প্রক্রিয়াটা নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে উপনিবেশিতদের হাতে পাঠ্যপুস্তকের নামে তুলে দিয়েছে নতুন পুস্তকরাশি–ভিন্ন এক জগতের ভাষিকমূর্তি।
এই প্রক্রিয়ায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের উদ্যোগে বাংলা গদ্য তৈরির প্রক্রিয়ায় রচিত হয়েছে নানা ধরণের বইপত্র। এসব বইয়ে বিবৃত সংস্কৃতি, ইতিহাস, ধর্মবোধ সবই পূর্বের তুলনায় ভিন্ন। ধারাবাহিক বিশ্লেষণে দেখা যাবে শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যপুস্তকের এই বদল বাংলাদেশের মানুষের শত শত বছরের সংস্কৃতি, জ্ঞানচর্চা, ধর্মীয় বিশ্বাসের থেকে ভিন্ন এক সংস্কৃতি, জ্ঞান, ইতিহাস প্রস্তাব করেছে। পরিস্থিতির চাপে পড়ে সেই জ্ঞান ও সংস্কৃতিই আত্মস্থ করতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। প্রজন্মক্রমে বহু বছর ধরে এই শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে থেকে ক্রমে পরিবর্তিত সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ভাবজগতকেই মেনে নিয়েছে তার মন এবং বুদ্ধিও।
মধ্যযুগের বাংলাদেশের শিক্ষা পদ্ধতি ছিল এ কালের থেকে বেশ ভিন্ন। ঐযুগের বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থের বিবরণ থেকে জানা যায় তখন মুসলমানদের মক্তব মাদ্রাসা, আর হিন্দুদের চতুষ্পাঠী, টোলকেন্দ্রিক শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। সাধারণত মসজিদে ও সম্পদশালী মানুষের বাড়িতে মক্তব পরিচালিত হতো। মক্তব ছিল প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র। মুসলমান শিশুরা মক্তবে পড়তে আসতো। সাধারণত চার সাড়ে চার থেকে ৭ বছরের মধ্যেই বাচ্চাদেরকে মক্তবে পাঠানো হতো। পড়াতেন মৌলভী সাহেব। এ জাতীয় পড়াশোনায় প্রাধান্য পেতো ধর্মীয় শিক্ষাই। রাষ্ট্রীয় এবং অবস্থাপন্ন মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগ উভয় উৎস থেকেই নির্বাহ হতো মক্তবগুলোর ব্যয়ভার। প্রায় প্রতিটি গ্রামে মক্তব পরিচালিত হতো বলে মুসলমান ছেলেমেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষার যথেষ্ট সুযোগ ছিল।
আকবরের সময় বাচ্চাদেরকে সহজে পড়াবার নিমিত্তে একটি সহজ পাঠ্যসূচীর প্রণয়ন করা হয়েছিল বলে জানা যায়। গদ্যে এবং পদ্যে উভয় মাধ্যমে পড়ানো হতো তখন। সে সময় মক্তব পর্যায়ে আরবী শিক্ষা, কোরআন-হাদিস পাঠ, ইসলামের মুলনীতি এবং বাংলা ভাষা শিখানো হতো, সেই সঙ্গে হিসাবনিকাশ সংক্রান্ত প্রাথমিক জ্ঞানও। শমসের গাজীর পুঁথি নামক কাব্যে উল্লেখ আছে, শমসের গাজী একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং ঢাকা থেকে ফারসির, হিন্দুস্তান থেকে আরবীর এবং জুগদিয়া থেকে বাংলার শিক্ষক নিয়ে আসেন। এ ছাড়াও হিসাব নিকাশ সম্পর্কিত প্রাথমিক জ্ঞান বিদ্যালয়গুলোতে দেয়া হতো। প্রাথমিক অর্থাৎ মক্তব পর্যায়ে ছেলেমেয়েরা একসাথেই পড়তো। লায়লী এবং মজনু একসাথেই মক্তবে যেতো বলে বর্ণনা রয়েছে। ফারসি ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থাও থাকতো কোনো কোনো মক্তবে।
উচ্চ শিক্ষার জন্য ছিল মাদ্রাসা। সারাদেশে মাদ্রাসার সংখ্যা ছিল যথেষ্ট। সমস্ত নগর ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে মাদ্রাসা পরিচালিত হতো বলে জানা যায়। আরো উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিখ্যাত ছিল উচ্চতর শ্রেণির মাদ্রাসা। এর মধ্যে বাঘা, গৌড়, পান্ডুয়া, সোনারগাঁও, চট্টগ্রাম প্রভৃতি স্থানে পরিচালিত মাদ্রাসায় উত্তর ভারত থেকেও ছাত্ররা পড়তে আসতো।
মাদ্রাসার পাঠ্যসূচী ছিল বিস্তৃত। আবুল ফজলের বর্ণনা থেকে জানা যায় মাদ্রাসায় নীতিশাস্ত্র, গণিত, কৃষি, পরিমাপ শাস্ত্র, জ্যামিতি, জ্যোতিষবিদ্যা, গার্হ্যস্থ বিদ্যা, আইন, চিকিৎসাবিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা, ইতিহাস ইত্যাদি পড়ানো হতো। এসব মাদ্রাসাগুলো ছিল অবৈতনিক, এমনকি কোনো কোনোটায় থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও ছিল। ফলে পড়ার সুযোগ পেতো গরীব মুসলমান ছাত্ররাও।
মুসলমান সম্পদ্রায়ের মতই হিন্দুদের মধ্যেও শিক্ষার সুব্যবস্থা ছিল। সাধারণত ধনী ব্যক্তিদের বাড়িতে অথবা বাড়ির সামনে গাছতলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোন চলতো। পড়াশোনা ছিল গুরুকেন্দ্রিক। সচরাচর গুরু একটি টোলে বসতেন আর ছাত্ররা মাদুর পেতে পড়াশোনা করতো। প্রতিটি গ্রামেই এ ধরণের প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। এসব বিদ্যালয়েও ছেলেমেয়ে উভয়েই একসাথে পড়াশোনা করতো। তবে আদি মধ্যযুগে পাঠের একচ্ছত্র অধিকার ছিল ব্রাহ্মণ সন্তানদের। পরে এ অবস্থার উন্নতি হয়, পড়াশোনার সুযোগ পায় অন্যরাও। সম্ভবত মুসলিম সমাজে মানুষের শ্রেণিহীন জীবনব্যবস্থা এবং শ্রীচৈতন্যের সাম্যবাদী দর্শনের প্রভাবে এ পরিবর্তন ঘটে থাকবে।
এরপর হিন্দু ছাত্ররা উচ্চশিক্ষার নিমিত্তে প্রবেশ করতো টোলে। টোলগুলা ছিল মুখ্যত ব্রাহ্মণ ছাত্রদের সংস্কৃত শিক্ষার কেন্দ্র। রাজভাষা ফারসি এবং মাতৃভাষা বাংলা শিক্ষার ব্যবস্থাও ছিল কোনো কোনো টোলে। প্রধান প্রধান পাঠ্য বিষয় ছিল সংস্কৃত ভাষা, কাব্য, ব্যাকরণ, জ্যোতিষশাস্ত্র, দর্শন, চিকিৎসাবিদ্যা, ইতিহাস, ছন্দ, নিরুক্ত প্রভৃতি। কালীদাসের রচনা, অমরকোষ, পাণিনীর ব্যাকরণ, রামায়ন ও মহাভারত ইত্যাদি ছিল পাঠ্যপুস্তক। এগুলোর অধিকাংশই সংস্কৃত ভাষায় লিখিত বলে সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ স্তরের উচ্চ শিক্ষা শেষে আগ্রহী ছাত্ররা আরো এলেম লাভ করার জন্য যেতো নামকরা শিক্ষাকেন্দ্রে। যেমন: নবদ্বীপ, সাতগাঁও, বাকুঁড়া, সিলেট, চট্টগ্রাম প্রভৃতি স্থানেও বিখ্যাত উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র ছিল। বৃটিশ দখলদারিত্বের আগ পর্যন্ত এই ছিল বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক চিত্র।
বৃটিশরা ক্ষমতা দখলের পর পর রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনেতিক রদবদলের কারণে প্রথমাবস্থায় এ শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়তে থাকে। অন্যদিকে, বৃটিশ ও অন্যান্য ইউরোপীয়রা তাদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য নিজ নিজ দেশের অনুকরণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে আগ্রহী হয়ে উঠে। ১৭২০ থেকে ৩১ সালের মধ্যে কলিকাতায় প্রথম ইউরোপীয় ধাঁচে একটি চ্যারিটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন রেভারেন্ড বেলামী। এরপর যে স্কুলটির কথা জানা যায় সেটি স্থাপন করেন সুইডিশ ধর্মযাজক জে জে কিয়ারনান্ডার, ১৭৫৮ সালে। এরপর কোম্পানির উদ্যোগেও কিছু স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবে হয়তো। কিন্তু এ সকল স্কুলই ছিল ইউরোপীয় ছেলেমেয়েদের পড়ানোর জন্য। বেলামীর স্কুলে নাকি ৬ জন বাঙালি ছাত্রও ছিল। থাকলেও বা। ওরা তো ইউরোপীয় শিক্ষাই পেতো।
প্রকৃতপক্ষে, বাঙালিদের জন্য প্রথম ইউরোপীয় ধাঁচের স্কুল খুলেন উইলিয়াম কেরি, মদনাবাটিতে ১৭৯৪ সালে। এ স্কুলে জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকল ছাত্রছাত্রী পড়তে পারতো বলে জানা যায়। তাই বলা যায় দেশীয় শিক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তে ইউরোপীয় কায়দায় স্থানীয়দেরকে শিক্ষাদানের সূচনা এইখানে, মদনাবাটিতে। এরপর থেকে কোম্পানি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত স্কুলের পাশাপাশি মিনারীদের দ্বারা পরিচালিত স্কুলের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। অন্যদিকে, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, সমাজে পূর্বের ধনী ব্যক্তিদের পতন ইত্যাদি কারণে চুতুষ্পাঠী, মক্তব, মাদ্রাসা টোলগুলো উঠে যেতে থাকে। তার জায়গায় স্থান করে নেয় ইউরোপীয় ধাঁচের স্কুল। সারা বাংলাদেশেই এ ধরণের স্কুল বসতে থাকে। ১৮১৭ সাল নাগাদ কেবল শ্রীরামপুর ও আশপাশে স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় ৪৫টি, আর চুঁচুড়ায় ৩৬টি। এসব স্কুলে হিন্দু মুসলমান উভয় ধর্মের ছাত্ররা পড়াশোনা করতো। কোনো কোনো স্কুল কেবল স্থানীয়দের জন্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৮১৭ সালে স্কুল বুক সোসাইটি এবং পরের বছর কলিকাতা স্কুল সোসাইটি স্থাপিত হয় বেসরকারী উদ্যোগে। ১৮২৩ সালে গঠিত হয় ‘জেনালের কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন’। এরপর ১৮৩৫ সালে মেকলের শিক্ষানীতি গৃহীত হওয়ার মধ্য দিয়ে টোল-মক্তব-মাদ্রাসা যুগের শিক্ষাব্যবস্থায় স্থায়ী ইতি টানার সূচনা হয়।
এদিকে দ্রুত বাড়তে থাকে ইউরোপীয় ধাঁচের বিদ্যালয়ের সংখ্যা। ১৮২০ সালে কলিকাতায় টোল ছিল ২৮টি, ছাত্র ১৭৩। কলিকাতা স্কুল সোসাইটির রিপোর্ট অনুযায়ী ১৮১৮-১৯ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা শহরে চলমান বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৯০টি বলে উল্লেখ করা হয়, ছাত্র সংখ্যা ৪১৮০।
বৃটিশ ধাঁচের বিদ্যালয় চালু হওয়ার সাথে সাথে দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়নি। ১৮৫৫ সালে পাদ্রী জেমস লঙ অন্য কথা প্রসঙ্গে লিখেন যে, সারা দেশে ৪০ হাজার পুরানা ধাঁচের স্কুল চলছে। গবেষকরা সন্দেহ করেন এ সংখ্যা ফোলানাফাঁপানো। তবে একটা কথা নিদ্বির্ধায় বলা যায় যে বাঙালির নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমশই সংকোচিত হয়ে মূল্যহীন হয়ে পড়ছিল। ১৮৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশে অনেক ইউরোপীয় তথা বৃটিশ ধাঁচের স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। সে বছর মেকলের শিক্ষানীতি গ্রহণের মধ্য দিয়ে ভারতে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাদানের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত পাকা হয়ে যায়। ফলে নতুন ধরণের স্কুলগুলোরই গুরুত্ব বাড়ে।
বাঙালির নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার মধ্য দিয়ে যে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয় তার পাঠ্য কি ছিল সে বিষয়ে জানাই আমাদের এ নাতিদীর্ঘ আলোচনার লক্ষ্য। আমরা জানি মধ্যযুগে হিন্দু-মুসলিম উভয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল মুখ্যত ধর্ম-প্রভাবিত, উদ্দেশ্য ছিল ধর্মবোধ ও ঈশ^র সম্পর্কে জ্ঞানদান এবং ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন উপায়ে জ্ঞানের অন্যান ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক শাখার বিষয়াদি সম্পর্কে শিক্ষাদান। কিন্তু বৃটিশ কায়দার শিক্ষাপদ্ধতি ধর্মকে আর সবকিছু থেকে আলাদা করে দিয়েছিল। ধর্ম সেখানে জ্ঞান অর্জনের একটা ক্ষেত্র মাত্র, যেমন ইতিহাস, যুক্তিবিদ্যা বা ভুগোল ইত্যাদি। ইউরোপের জ্ঞানর্চ্চার কার্যকারণবাদী বা তথাকথিত আলোকায়নের যুগে ধর্মকে রাষ্ট্র ও সামাজিক বিষয়াদি থেকে আলাদা করে নেয়া হয়। ফলে জ্ঞানচর্চার ভিত্তি হিসাবে ধর্মের আর কোন ভূমিকা থাকেনি। এ কারণে বৃটিশ শিক্ষাপদ্ধতিতে ধর্ম পরিণত হয় জ্ঞানার্জনের আরেকটা বিষয়ে, জ্ঞানার্জনের ভিত্তি বা কৌশল হিসাবে ধর্মের কোনো অবস্থান নেই। এই পরিবর্তনের ফলে নতুন ধরণের বিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যসূচীর রদবদল হয় ব্যাপক, বিশেষত ১৮১৭ সালের মে মাসে স্কুল বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা এবং পরের বছর কলিকাতা স্কুল সোসাইটি গঠনের পর। এ দুই সোসাইটির কাজ ছিল পাঠাশালাগুলোর উন্নতি করা, নতুন পাঠশালা প্রতিষ্ঠা, পাঠশালায় পড়নোর মত উন্নত মানের বইপত্র লিখিয়ে মুদ্রিত করে অল্পমূল্যে প্রচার করা ইত্যাদি। এর আগে পর্যন্ত হাতে লেখা পুঁথিই চলছিল।
নতুন পাঠ্যতালিকায় একদিকে থাকে বৃটিশ জ্ঞানর্চ্চার প্রভাব, অন্যদিকে নীতিগত পরামর্শের সাথে জড়িত পন্ডিতদের পছন্দের কিছু বিষয়, যেমন হিন্দু ধর্মীয় আখ্যান উপাখ্যান, ধর্মীয় লোককাহিনি যেমন রামায়ন মহাভারত ইত্যাদি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন যেটা ঘটে তা হলো নতুন ধাঁচের স্কুল আর পুরানা টোল যাই হোক, সবার পাঠ্যসূচীতে পরিবর্তন আসে স্কুল বুক সোসাইটি ও অন্যান্য তরফে বই ছাপা ও দেশব্যাপী বিলির কারণে। কেবল স্কুল বুক সোসাইটিই ১৮১৭ সাল থেকে ১৮২৫ সালের মধ্যে একলক্ষর বেশি বই ছেপে বিলি করে। উনিশ শতকের প্রথমার্ধের্¦ বিদ্যালয়ে পাঠ্য বইয়ের বাজারে এদেরই ছিল একচেটিয়া কর্তৃত্ব। ক্রমে এদের তৎপরতা কমে আসে, সেই জায়গা দখল করে নেয় সংস্কৃত প্রেস।
এর আগে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে লেখা হয়েছে বাংলা গদ্যের ১৩টি বই। সেগুলো অবশ্য কলেজের সাদা ছাত্রদের পাঠ্য। পরবর্তীকালে এগুলোও সাধারণের পাঠ্যে পরিণত হয়। এসব বই এবং অন্যান্য উৎস থেকে উৎপাদিত বইপত্র ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশের বিদ্যালয়সহ পড়াশোনা জানা লোকজনের হাতে। শিক্ষার ধর্মভিত্তিক বৈচিত্র শেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটাও উল্লেখযোগ্য। যেমন হিন্দুদের শিক্ষার বিষয় ছিল একরকম, মুসলমানদের কিছুটা আরেক রকম, বৌদ্ধদের আরেকটু ভিন্ন ধরণের। এ সকল পার্থক্য ¯্রফে উড়ে যায় বৃটিশদের অনুকরণে প্রতিষ্ঠিত নতুন ধাঁচের বিদ্যালয়গুলোর একীভুত শিক্ষাপদ্ধতিতে। বিদ্যালয়গুলোতে মোটামুটি সমধর্মী বইপত্রই পড়ানো হতো। এভাবে সমধর্মী পাঠ্যসূচী, একই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, একই রকম পাঠদান পদ্ধতি–এসবের মধ্য দিয়ে একটি একমুখি শিক্ষাপদ্ধতি চালু হয়। যদিও টোল ও মাদ্রাসাগুলি তখনো চলছিল, তবু মূল শিক্ষাপদ্ধতি হিসাবে নতুন ধাঁচের শিক্ষাই প্রভাবশালী হয়ে উঠে।
কি পড়ানো হতো ঐসব বিদ্যালয়ে? বিভিন্ন সূত্রে কিছু কিছু বইয়ের নাম পাওয়া যায়। ‘আদিযুগের পাঠ্যপুস্তক’ প্রবন্ধে নিখিল সরকার কিছু বইয়ের নাম দিয়েছেন। যেমন: মে’র পাটিগণিত, স্টুয়ার্টসের পাঠমালা, রাধাকান্তের নীতিকথা প্রথমভাগ ও ধারাপাত, পিয়ারসনের নীতিকথা দ্বিতীয়ভাগ, রামমকমল সেনের নীতিকথা তৃতীয়ভাগ, ফেলিক্স কেরির ব্রিটিন দেশীয় বিবরণ সঞ্চয়, তারাচাঁদ দত্তের মনোরঞ্জন ইতিহাস, লসনের পশ^াবলি, ক্ষেত্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের গ্রীসের ইতিহাস, বিষ্ণু শর্মার হিতোপদেশ ছাড়াও বীজগণিত, গণিতসার, জীবতত্ত্ব, পরিমাপ বিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, বঙ্গদেশের ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ক বিভিন্ন বই। পাদ্রী জেমস লঙ ১৮২০ সালে মুদ্রিত বইয়ের যে তালিকা দিয়েছেন তাতে দেখা যায় অধিকাংশ বই কৃষ্ণলীলা, দেবদেবীর উপাখ্যান আর আদিরসাত্মক কাহিনি বিষয়ক। অল্প কিছু আছে ব্যাকরণ, জ্যোতিরবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা সংক্রান্ত গ্রন্থ ও পঞ্জিকা, ইত্যাদি। ১৮২৬ সালে ছাপা বইয়ের তালিকাতেও একই অবস্থা: ২৭টি বইয়ের মধ্যে ১৩টি হিন্দুধর্ম বিষয়ক বা দেবদেবী আর্য রাজাদের আখ্যান। অন্যগুলোর বেশিরভাগই হিন্দু নীতিবোধ, ধর্মীয় সঙ্গীত ইত্যাদি। পাঠকদের আগ্রহ মেটানোর জন্য তালিকা দুটো জুড়ে দেয়া হলো।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ চালু হওয়ার পর বাংলা গদ্যের প্রথম বই রামরাম বসুর প্রতাপাদিত্যচরিত্র, ছাপা হয় ১৮০১ সালে। এটি কোনো বাঙালির লেখা প্রথম বাংলা গদ্যগ্রন্থ। প্রায় সাথে সাথেই বের হয় উইলিয়াম কেরির কথোপকথন। এরপর একে একে প্রকাশ হয় রামরাম বসুর অপর রচনা লিপিমালা (১৮০২), গোলকনাথ শর্মার হিতোপদেশ (১৮০১), মৃতুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের বত্রিশসিংহাসন (১৮০২), হিতোপদেশ(১৮০৮) ও রাজাবলী(১৮০৮), রাজীব লোচন মুখোপাধ্যায়ের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্ররায়স্যচরিত্রং (১৮০৫), চন্ডীচরণ মুনসির তোতা ইতিহাস (১৮০৫), হরপ্রসাদ রায়ের পুরুষপরীক্ষা(১৮১৫) ইত্যদি। ১৮০১ সাল থেকে ১৮১৫ সালের মধ্যে ৮ জন লেখকের ১৩ টি বই প্রকাশিত হয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে। অন্যদিকে শ্রীরামপুর মিশন থেকে অন্যান্য বইয়ের পাশাপাশি ছাপা হচ্ছিলো রামায়ন, মহাভারত ইত্যাদি লোকআখ্যানও। ছাপাখানার বদৌলতে বই জিনিষিটা সুলভ হয়ে যায় বাঙালির কাছে। আগে যা তারা দলবেধে রীতিমত আনুষ্ঠানিকতা করে কথকের মুখে কাহিনি হিসাবে শুনতো ছাপখানার কারণে সেগুলোর মূল বই-ই তাদের হাতে পৌঁছে যায়। ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এ অবস্থাটার কথা তুলে ধরেছেন এভাবে: “শ্রীরামপুরে ছাপা কৃত্তিবাসের রামায়ন ও কাশীরামের মহাভারত গ্রামে গ্রামে পৌঁছে যায়। জনশিক্ষার জন্য কথকতা, পাঁচালী গান, মঙ্গলগান প্রভৃতি যে-পুরাতন লৌকিক উপাদান আমাদের ছিল শ্রীরামপুরে ছাপা এই বইগুলি তারই স্থান অধিকার করেছিল”।
ছাপা বইয়ের তালিকায় কেবল ধর্মীয় রচনা বা আর্য দেবদেবী রাজরাজড়াদের আখ্যানের ছড়াছড়ির কারণটা আমরা আগে উল্লেখ করেছি। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার সময় ইংরেজরা ধরে নেয় মুসলমানরা ভালো বাংলা লেখতে পারে না, তবে সংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণ পন্ডিতরা বাংলা ভাষায় সবিশেষ দক্ষ। সংস্কৃত পন্ডিতদের দ্বারাই বাংলা বইপত্র লেখাতে হবে। তাই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে ফারসি ও উর্দু ভাষার বই লেখার জন্য নেয়া হয় মুসলমান মৌলভী। বাংলা বইপত্র লেখার জন্য বাংলা-জানা লোক না নিয়ে ডেকে আনা হয় সংস্কৃত জানা পন্ডিতদের। প্রাক-উপনিবেশ কাল পর্যন্ত যেসব হিন্দু মুসলিম কবি, কবিয়াল, শায়ের, গদ্যলেখক বাংলা সাহিত্যের চর্চা করতেন তারা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বই লেখার সুযোগ পান নাই। এ কারণে বাঙালির আসল ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য, কিস্সা, কাহিনি, সাহিত্যে সমাজের প্রতিফলন সবই চিরতরে হারিয়ে যায়। সেইসঙ্গে হারায় প্রচলিত বাংলাগদ্যের ধরণও। তাছাড়া, ব্রাহ্মণ পন্ডিতদের হাতে বাংলা বইপুস্তক লেখার ভার পড়ায় লেখা হয় দেবদেবীর উপাখ্যান, ধর্মগ্রন্থ প্রভৃতি। কারণ তারা ছিলেন সংস্কৃত শাস্ত্র ব্যবসায়ী. তাদের বিদ্যার দৌড়ও ঐ পর্যন্ত। এর ফলে বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে দুইটা প্রবণতা জারি থাকে, এক: গণিত, চিকিৎসাবিদ্যা, বীজগনিত প্রভৃতির সাথে বৃটেন দেশীয় ইতিহাস, বিবরণ, ভুগোল ইত্যাদি পড়ার ঝোঁক; দুই: প্রাচীন আর্য, রাজা, ঋষি, সামন্ত, দেবদেবীদের আখ্যান, কৃষ্ণলীলা ইত্যাদি সম্পর্কিত ও ধর্মীয় বইপত্র পাঠ্য হিসাবে গ্রহণ। বিদ্যালয়ের বাইরে সাধারণের পড়ার জন্য যেসব বই ছাপা হতো তাতেও এগুলারই প্রাধান্য ছিল।
এ অবস্থায় বাঙালি হিন্দু ছাত্রছাত্রীদের সামনে ছিল দুটো বিকল্প: হয় নতুন ধাঁচের স্কুলগুলোতে পড়াশোনা করে ইংরেজের চাকরি নিয়ে অর্থ উপার্জনের ব্যবস্থা করা, নয়তো আগের ধাঁচের ধর্ম-প্রভাবিত ঐতিহ্যভিত্তিক শিক্ষা গ্রহণ করে হীনতর সামাজিক ও আর্থিক অবস্থানে পতিত হওয়া। এই একই সুযোগ মুসলমানদের সামনে আসে ভিন্ন ঐতিহ্যিক ও ধর্মীয় সংঘাতময় অবস্থান নিয়ে। মুসলমানরা হয় মাদ্রাসার শিক্ষা নিয়ে বেকার, দরিদ্র, সামাজিক মর্যাদাহীন জীবন যাপন করবে; অথবা নতুন ধরণের শিক্ষাব্যবস্থায় বৃটেন দেশীয় বিবরণ ও হিন্দু দেবদেবীদের আ্যখান পাঠ করে ইংরেজের চাকরী নিয়ে দু পয়সার মুখ দেখবে।
মুসলমানদের সামনে এ ছিল প্রকৃতই এক অচলাবস্থা। ইতিহাস থেকে আমরা জানি এ পরিস্থিতিতে মুসলমান দীর্ঘদিন অচল হয়েই বসেছিল, যখন হিন্দুরা এসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে চাকুরী নিয়ে রীতিমত ভালো অর্থ উপার্জনের পথ বেছে নেয়। এডামের রিপোর্টে দেখা যায় সে সময় হিন্দু মুসলিম ছাত্রের অনুপাত ছিল ১০ : ১। এ চিত্র রীতিমত ভয়াবহ। এর মূল কারণ ছিল ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার কথা বললেও বিদ্যালয়গুলোতে মূলত পড়ানো হতো ইংরেজের ইতিহাস, ভুগোল, গণিত আর আর্য দেবদেবী রাজরাজড়াদের কাহিনি, তাদের ধর্ম-সংশ্লিষ্ট গ্রন্থাদি। নতুন ধাঁচের শিক্ষায় কেন মুসলমানরা পিছিয়ে পড়েছিল তারও একটা ভুল ব্যাখ্যা আমাদের ইতিহাসে চালু আছে। বলা হয়ে থাকে ইংরেজি শিক্ষাকে ঘৃণা করেই তারা এসব বিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণে এগিয়ে আসেনি। বিদ্যালয়গুলোতে ঐ সময়ের পাঠ্যসূচীর দিকে নজর দিলেই বোঝা যাবে সেটিই একমাত্র কারণ নয় ।
যাইহোক, পাঠ্যপুস্তকের এ অবস্থার উন্নতি হয়নি দীর্ঘদিন। এমনকি ১৮৫৭ সালে ছাপা ৩২২টি বইয়ের নামপরিচয় থেকে দেখা যায় এর মধ্যেও হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতি বিষয়ক বই ছিল ১০০টিরও বেশি । এ অবস্থা কাটিয়ে উঠার একমাত্র রাস্তা ছিল ঐসব স্কুলে পড়াশোনা করা এবং সংস্কৃতায়িত বাংলা রপ্ত করে লেখকসাহিত্যিক হয়ে সমাজ পরিবর্তনের প্রয়াসে লিপ্ত হওয়া। মুসলমান তাও করেছিল তবে অনেক পরে। তার মধ্যে পার হয়ে যায় শতকের অর্ধেকেরও বেশি সময়।
এখানে আমরা তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের দিকগুলো চিহ্নিত করে রাখতে চাই, পরবর্তী আলোচনার জন্য। প্রথমত: ইউরোপীয় ধাঁচের বিদ্যালয়ের কারণে অনেক বেশি সংখ্যক ছাত্র পড়ার সুযোগ পায়। সেখানে জাতিধর্ম নির্বিশেষে সব ছাত্রই পড়তে পারতো। যদিও মুসলমানরা একবারে নগণ্য সংখ্যায় যুক্ত হয়েছিল। দ্বিতীয়ত: পূর্বের ধর্মচর্চাকেন্দ্রিক পাঠ্যসূচীর বদলে নতুন পাঠসূচী চালু হয়। নতুন পাঠ্যসূচীতে ইংরেজি ভাষা, ইউরোপীয় দেশের ইতিহাস, ভারত বর্ষের প্রাচীন ইতিহাস, রামায়ন মহাভারত প্রভৃতি আর্য উপাখ্যান, হিন্দু ধর্মীয় নীতিকথা, গণিত, ভূগোল, ব্যাকরণ ইত্যাদি গুরুত্ব পায়। এই পাঠ্যসূচী ছিল হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান ধর্মনির্বিশষে সকল ছাত্রের জন্য। কাজেই আগের তুলনায় হিন্দু ছাত্রদের পাঠ্যসূচীতে সামান্য পরির্তন আসে, নতুন যুক্ত হয় ইংরেজি ভাষা ও ইংল্যান্ডের ইতিহাস, ভুগোল ইত্যাদি। কিন্তু মুসলমান বা বৌদ্ধ ছাত্রদের জন্য পুরো সিলেবাসই পাল্টে যায়। নতনু সিলেবাসে এমন হয় যে, রামায়ন মহাভারত আর আর্য দেবদেবীদের কাহিনি ইত্যাদি পড়তে হবে বিধায় দীর্ঘদিন ছেলেমেয়েদেরকে এসব স্কুলে পড়তে পাঠায়নি রক্ষণশীল মুসলমানরা।
কিন্তু এ ছিল কালের নির্ধারিত বিন্যাস। ফলে একসময় বাধ্য হয়ে এসব পাঠ্যসূচীর পড়াশোনাতেই অংশগ্রহণ করে মুসলমানরা। এভাবে ইতিহাস, নীতিবোধ, কল্পনা, চিন্তার এক নতুন জগতে পা ফেলে মুসলমান ছাত্রদের থেকে শুরু করে সাধারণ বাঙালি মুসলমান পাঠক সকলেই।
ইতিহাসের বিকৃতি
বাংলাভাষার সংস্কৃতায়নের সূত্রে নতুন গদ্যরীতিতে বইপুস্তক রচনা শুরুর প্রথম থেকেই প্রাচীন আর্য রাজন্যবর্গ, দেবদেবী, লোক আখ্যানের দিকে নজর পড়ে পন্ডিতদের। কারণ সংস্কৃতজ্ঞ ঐসব পন্ডিতদের বিদ্যার দৌড় ছিল ঐ পর্যন্ত, আর ধর্মীয় কারণে আগ্রহের জায়গাও ঐটাই। বাঙালির লেখা প্রথম গদ্য বই রামরাম বসুর প্রতাপাদিত্যচরিত ইতিহাসের সামান্য এক চরিত্র নিয়ে লেখা, ছাপা হয় ১৮০১ সালে। এটি সাদা ছাত্রদের জন্য লেখা হলেও পরে বাঙালি পাঠকদের মধ্যে খুব জনপ্রিয় হয়। একইরকম পাঠকপ্রিয় আরেকটি বই রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়ের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্ররায়স্যচরিত্রং, প্রথম বের হয় ১৮০৫ সালে। আরো পরে প্রকাশিত হয় নীলমনি বসাকের ভারতবর্ষীয় ইতিহাস ১ম ভাগ ও ২য় ভাগ। এ ছাড়া কিস্সার চরিত্র মহারাজ বিক্রমাদিত্যের আখ্যান বত্রিশ সিংহাসন-এ বিক্রমাদিত্যের কাল্পনিক মাহাত্মের কাহিনি আর্য-গৌরবের কাঙাল ব্রাহ্মণ পন্ডিতদের মনে খানিকটা বিশ^স্ততার মর্যাদা পায়। এটিও সে কালের বেশ জনপ্রিয় একটি বই।
ভারত বর্ষের লিখিত ইতিহাসের সূচনা মুসলিম শাসনামলে। বারানী, ফিরিশতা, মিনহাজ, বাদায়ূনী, মির্জা নাথান প্রমুখ মুসলিম শাসনামলের যে বিবরণ লিখে গেছেন মূলত তার উপর ভিত্তি করেই প্রথম বারের মতো ভারতবর্ষের ইতিহাস রচনার সূচনা। পরে ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে আরো বিভিন্ন উৎসের সাক্ষ্যও পাওয়া যায়। বাংলা ভাষার রূপান্তরের মধ্য দিয়ে নতুন গদ্য রীতির পুস্তক রচনার প্রয়োজনে লেখা হয় প্রতাপাদিত্যচরিত, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্ররায়স্য চরিত্রং ও এ জাতীয় অন্যান্য বই। আমরা দেখবো এসব বইয়ে ইতিহাসকে নিরপেক্ষতার সাথে লেখা হয়েছে কি না, না হয়ে থাকলে কতটা বিকৃত করা হয়েছে এবং কেন? তার উদ্দেশ্য ও পরিণামই বা কি?
রাজা প্রতাপাদিত্যচরিত ” উনিশ শতকে কলিকাতার উচ্চবর্ণের হিন্দু মনের যে কটি গৌরবের বস্তু তার একটি হলো বাংলার বারো ভুঁইয়ার একজন, যশোরের সামন্ত প্রতাপাদিত্যর কাহিনি। প্রথমে ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর অন্নদামঙ্গল কাব্যে তার কাল্পনিক বীরত্বগাথা রচনা করেন। ইতিহাসের সামান্য সাদামাটা সূত্র অবলম্বন করে এ রকম কল্পকাহিনি রচনা মধ্যযুগের কবিদের স্বাভাবিক কবি প্রতিভার বৈশিষ্ট হিসাবে দেখা হয়। এইটুকু অবলম্বন করে রামরাম বসু উনিশ শতকের শুরুতে লিখলেন রাজা প্রতাপাদিত্যচরিত। এবার কিন্তু এ কল্পকাহিনি আর কল্পকাহিনির সীমায় আবদ্ধ থাকে না। বইটি জনপ্রিয় হওয়ার কারণে সারা বাংলায় বহু পাঠক তা পাঠ করে সত্য ইতিহাস হিসাবে। উপনিবেশের দড়িতে বান্ধা তাদের মনের মানসিক অহংকারের জায়গা হিসাবে প্রতাপাদিত্য পরিণত হয় গৌরবের উপলক্ষ্যে। প্রায় পঞ্চাশ বছর পর হরিশচন্দ্র তর্কালঙ্কার আরেকটু ফুলিয়েফাঁপিয়ে লিখলেন মহারাজ প্রতাপাদিত্য চরিত্র। এইসব বইয়ের কল্পকাহিনি পাঠকের কাছে সত্য বলে গৃহীত হয়।
প্রতাপাদিত্য নামক বইয়ের সম্পাদক শ্রীনিখিলনাথ রায় বিএল আমাদের জানাচ্ছেন, “বাঙ্গালী জীবনে যিনি স্বাধীনতার রসাস্বাদে নিজ আত্মাকে তৃপ্ত করিয়াছিলেন, তিনি যে বাঙ্গালীর গৌরবের বস্তু ইহা অস্বীকার করার উপায় নাই।যদি কেহ একবার স্বাধীনতার শ^শানভুমি যশোর বা ঈশ^রীপুরে উপস্থিত হন, তিনি দেখিতে পাইবেন, দেবী যশোরেশ^রীর ভগ্ন মন্দির হইতে আরম্ভ করিয়া বহুদূর বিস্তৃত ইতস্তত: বিক্ষিপ্ত ভগ্নাবশেষ আজিও প্রতাপের কীর্তির সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে।” এই বয়ানের ভাষা ও প্রকাশভঙ্গি থেকে আন্দাজ করা যায় নিখিল বাবু নিজেও এই কল্পকাহিনিতে বিশ^াসী ও গৌরবান্বিত।
কিন্তু এই প্রতাপাদিত্য ইতিহাসে নথিভুক্ত হয়েছেন সাদামাটা একজন সামন্ত হিসাবে একটিমাত্র অনুচ্ছেদের বিবরণে। তার সম্পর্কে বলা হয়েছে, “অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যে তাঁহার শক্তি, বীরত্ব ও দেশভক্তির যে উচ্ছ্বসিত বর্ণনা দেখিতে পাওয়া যায়, তাহার অধিকাংশরই কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নাই।” রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রতাপাদিত্য সম্পর্কে সাকুল্যে এক প্যারা লিখছেন তার বাংলাদেশের ইতিহাস (দ্বিতীয় খন্ড) গ্রন্থে।
আমাদের মনে রাখতে হবে বাঙালি ইতিহাস লেখার আগে প্রতাপাদিত্য বা কৃষ্ণচন্দ্ররায়স্য চরিত্রং-এর মত কল্পকাহিনি লিখেছে। এবং সাধারণ বাঙালির প্রায় ঘরেঘরে সে কল্প কাহিনি পড়া হয়েছে, ইতিহাস পড়া হয়নি। ফলে রামরাম বসুর প্রতাপাদিত্যচরিত বা হরিশচন্দ্র তর্কালঙ্কারের মহারাজ প্রতাপাদিত্য চরিত্র পড়ে নিজ জাতির বীরত্ব সম্পর্কে বুদবুদের মত যে ধারণা জন্মেছে বেশিরভাগ মানুষের মনে তা কিন্তু পরবর্তী কালে লেখা ইতিহাসের গুণে মিথ্যা হয়ে যায়নি। ফলে এই যে কল্প-ইতিহাস, ফুলানো-ফাঁপানো কাহিনি তার পরিণাম হয় সুদূরপ্রসারী। বহুদশক ধরে সাধারণ বাঙালি পাঠক বইগুলো পড়ে পড়ে প্রতাপাদিত্যকে এক সত্যিকারের বাঙালি বীররূপে চিত্রিত করে। নিখিলনাথের ভাষায়: “বারো ভুঁইয়াদের মধ্যে মহারাজ প্রতাপাদিত্যের গৌরব বাঙ্গলার আবাল-বৃদ্ধবণিতার মুখে ধ্বনিত হইয়া আসিতেছে। ভারতচন্দ্রের অমর লেখনি তাঁহাকে চিরোজ্জ্বল করিয়া গিয়াছে। আজ বাঙ্গলার প্রতি গৃহ হইতে “যশোর নগরধাম, প্রতাপাদিত্য নাম” এই মহাগীতি তাহার জলভারাবনত বায়ূস্তরকে কম্পিত করিয়া অনন্ত স্পর্শ করিবার জন্য ধাবিত হইতেছে। যাঁহার নাম করিতে কঙ্কালসার বঙ্গবাসী পুলকে অধীর হইয়া পড়ে, বঙ্গশিশু আনন্দে করতালি দেয়, বঙ্গবালার অঙ্গ রোমাঞ্চিত হইয়া উঠে, “বরপুত্র ভবানীর, প্রিয়তম পৃথিবীর” সেই মহাগৌরবান্বিত বঙ্গবীরের কীর্ত্তিকাহিনি অমর কবি ব্যতিত আর কে চিত্রিত করিতে পারে! বঙ্গভূমিকে স্বাধীনতার লীলানিকেতন করিবার জন্য যিনি অদম্য অধ্যবসায় আশ্রয় করিয়াছিলেন, বঙ্গবাসীর কাপুরুষ নাম অপনোদনের জন্য যিনি তাহাদের বাহুতে শক্তি দিয়াছিলেন, বাঙ্গালীর রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য যিনি আসমুদ্র বিজয় নিশান উড্ডীন করিয়াছিলেন তাহার গৌরবগীতি গাহিতে কাহার না ইচ্ছা হয়।” উদ্ধৃতিটি থেকে আন্দাজ করা যায় প্রতাপাদিত্য সম্পর্কিত এইসব কল্পকাহিনি পাঠ করে সাধারণ মানুষ কতটা প্রভাবিত হয়েছিলেন।
আমরা দ্বিতীয় যে বইটি নিয়ে আলোচনা করবো তার নাম মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্ররায়সচরিত্রং, লেখক রাজীব লোচন মুখ্যোপাধ্যায়। এটি নদীয়ার জমিদার কৃষ্ণচন্দ্রের জীবনী। বইটি প্রথম ছাপা হয় ১৮০৫ সালে। এটিও খুব জনপ্রিয় একটি বই। সিরাজউদদৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে যারা পরোক্ষে অংশ নিয়েছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র তাদের নেতৃতস্থানীয়। তার বাড়িতে অনেক গোপন শলাপরামর্শও হতো। ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে কৃষ্ণচন্দ্রের হয়ে বেশিরভাগ যোগাযোগ রাখতেন তার বিশ^স্ত সহকারী কালী প্রসাদ সিংহ।
পলাশির ষড়যন্ত্রে যারা আড়ালে থেকে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে নদীয়ার জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন সবচেয়ে চতুর। তিনি হিন্দু জমিদার-সামন্তদের একত্রিত করে পলাশির ষড়যন্ত্রে সমর্থন যুগিয়ে প্রত্যক্ষ ষড়যন্ত্রকারী ও ইংরেজদের মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বহুগুণে। এর ফলে ইংরেজরা মনে করে নবাবের দরবার থেকে শুরু করে দেশীয় জমিদার আমাত্যশ্রেণী সকলেই নবাবের বিরুদ্ধে। তাই নবাবকে হটিয়ে দিতে পারলেই তাদের সফলতা আসবে। এই কৃষ্ণচন্দ্রের জমিদারীর পত্তন কিন্তু জনৈক দেশোদ্রোহীর মাধ্যমে। আমরা এখানে তার খানিকটা উল্লেখ করতে চাই।
বাংলার বারো ভুঁইয়ার অন্যতম যশোরের প্রতাপাদিত্যের সাথে মুঘল বাহিনীর যুদ্ধের সময় এক পর্যায়ে প্রতাপাদিত্য একটি দূর্ভেদ্য দূর্গে আশ্রয় নেন। অনেক কসরত করেও মুঘলবাহিনী সেখানে ঢুকতে পারছিল না। এ সময় দূর্গাদাস ওরফে ভবানন্দ এগিয়ে এসে দূর্গে প্রবেশের গুপ্ত পথ দেখিয়ে দেয় মুঘল বাহিনীকে। প্রতাপাদিত্যকে গ্রেফতার ও হত্যার পর বাদশাহ জাহাঙ্গীর খুশি হয়ে দূর্গাদাসকে ১৪টি পরগণার জমিদারী দেন ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে। প্রতিষ্ঠিত হয় নদীয়ার জমিদারী। দূর্গাদাসের অধস্তন পুরুষ কৃষ্ণচন্দ্রও একইভাবে দেশ-বিরোধী ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়ে পলাশির যুদ্ধে ইংরেজদের জয়ী হতে সাহায্য করেন। এর পুরস্কার হিসাবে ক্লাইভ তাকে পাঁচটি কামান এবং দিল্লীতে তদবির করে মহারাজা উপাধি আনিয়ে দেন। এভাবেই দেশোদ্রোহী দূর্গাদাসের বংশধর আরেক দেশোদ্রোহী জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র হয়ে উঠেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র।
রাজীব লোচন মুখোপাধ্যায় তার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্ররায়স্যচরিত্রং বইয়ে লিখেছেন, “শেষে এই পরামর্শ হইল যাহাতে জবন (মুসলমান) দূর হয় তাহার চেষ্টা করহ ইহাতে জগতসেট কহিলেন এক কার্য্য করহ নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় অতিবড় বুদ্ধিমান তাঁহাকে আনিতে দূত পাঠাও তিনি আইলেই যে পরামর্শ হয় তাহাই করিব। . . . পরে এক দিবস জগত সেঠের বাটীতে রাজা মহেন্দ্র (রায় দুর্লভ) প্রভৃতি সকলে বসিয়া রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়কে আহ্বান করিলেন দূত আসিয়া রাজাকে লইয়া গেল যথাযোগ্য স্থানে সকলে বসিলেন।”
রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়ের কাহিনিতে অতিরঞ্জন আছে বলে মন্তব্য করেছেন পলাশির ষড়যন্ত্র ও সে কালের সমাজ বইয়ের লেখক রজতকান্তি রায়। আমরা তার সাথে দ্বিমত পোষণ করি, অত্যন্ত যৌক্তিক কারণে। লেখক রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায় জমিদার কৃষ্ণচন্দ্রের আত্মীয় ছিলেন।নদীয়ার জমিদার কৃষ্ণচন্দ্রকে মহত ও বড় করার জন্য বইটি লেখা হয়। এ উদ্দেশ্যে রাজপ্রাসাদ, রাজসভা, অর্থবিত্ত, প্রতিপত্তি, চরিত্রগুণ ইত্যাদি ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানোর প্রয়োজন পড়ে। রাজীবলোচন তাই করেছেনে। কৃষ্ণচন্দ্রের চরিত্রকে যাবতীয় মানুষী ত্রুটি থেকে মুক্ত করে ঐশ^রিক চরিত্রে রূপান্তরিত করেছেন তিনি। তাঁর জমিদারী দফতরকে বাদশাহ আকবরের রাজসভাতুল্য করে বর্ণনা দিয়েছেন। তার প্রতিপত্তি, জনপ্রিয়তা, প্রজাপ্রীতি সবাই অতুলনীয়। এসবই কৃষ্ণচন্দ্রকে বড় করে দেখানোর কাজে লেগেছে। কিন্ত মিছামিছি পলাশির ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে যুক্ত করে দেখানোর মধ্যে তাকে বড় করার সুযোগ নাই। কৃষ্ণচন্দ্রের আত্মীয় হয়ে এ মিথ্যাচার কেন করবেন রাজীবলোচন? দ্বিতীয়ত বইটি লেখা হয় ১৮০৫ সালে। তখনো পলাশির যুদ্ধের সময়কার অনেকেই বেঁচে আছেন। বেঁচে ছিলেন জমিদার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের পরিবারের লোকজন। এ অবস্থায় তাকে ষড়যন্ত্রকারী হিসাবে দেখানোর মধ্যে ঝুঁকিও ছিল। তাছাড়া সেই ১৭৫৭ সাল থেকেই লোকমুখে কৃষ্ণচন্দ্র পলাশির ষড়যন্ত্রকারী হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আসছেন। এসব কারণে আমরা মনে করি না রাজীবলোচন এ নিয়ে মিথ্যাচার করেছেন।
আমরা এখানে দুজন ঐতিহাসিক ব্যক্তির জীবন অবলম্বনে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে কল্পকাহিনি রচনার উদাহরণ হিসাবে দুটো জনিপ্রয় বইয়ের উল্লেখ করলাম যেগুলো সাধারণের মনে সত্য ইতিহাসের মর্যাদা পেয়ে আসছে। সে কালে আরো কিছু চরিত্র নিয়ে এ জাতীয় গ্রন্থ রচিত হয়েছে। যেমন রাজা বিক্রমাদিত্য। রামায়ন মহাভারতের লোক আখ্যানগুলোর বিভিন্ন বীরত্বগাথা এবং বীর চরিত্রগুলোও বিবরণের গুণে ও ধর্মীয় আবেগের কারণে ঐতিহাসিব চরিত্র হিসাবে প্রভাব ফেলেছিল।
আমাদের আলোচনায় যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো নদীয়ার জমিদার কৃষ্ণচন্দ্রকে বিরাট ক্ষমতাধর, প্রতিপত্তিশালী রাজামহারাজা হিসাবে দেখানোর প্রয়াস, যে কাজটি নিষ্ঠার সাথে করেছেন রাজীবলোচন। এরপরেও বিভিন্ন জনের লেখায় কৃষ্ণচন্দ্র বিশাল এক শাসক এবং সর্বগুণে গুণান্বিত মানুষ হিসাবেই আবির্ভূত হয়েছেন। তার বিপরীতের সিরাজউদদৌলাকে চিত্রিত করা হয়েছে অযোগ্য, অর্বাচীন, অত্যাচারী ও লম্পট শাসক হিসাবে। শুধু সিরাজ উদদৌলাকেই নয়, এর আগের বিভিন্ন শাসক এবং দিল্লীর বাদশাদেরকেও একই রকমভাবে হীন চরিত্রের অধিকারী হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে উনিশ শতকের প্রথম দিকে লেখা বিভিন্ন বইয়ে।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের উদ্যোগে বাংলা ভাষার রূপান্তর এবং নয়া গদ্যরীতিতে বইপত্র লেখার উসিলায় এই যে ইতিহাস পুন:নির্মাণের সুযোগ তৈরি হলো তার পুরোটাই কাজে লাগান সে কালের লেখকগণ। এভাবে কাল্পনিক বা লোক চরিত্রকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ইতিহাসসদৃশ কাহিনি রচনা, রামায়ন মহাভারতের ব্যাপক প্রচার ইত্যাদির মধ্য দিয়ে আর্য জাতি সর্বাগুণে গুণান্বিত, দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ একটি বীর জাতি হিসাবে জনমনে জায়গা করে নেয়। এরই প্রভাবে আর্য জাতির উত্তরাধিকার হিসাবে একই মর্যাদা পায় বাঙালি হিন্দুও। একই দৃশ্যপটে বাঙালি মুসলমান চিত্রিত হয় নির্যাতনকারী, চরিত্রহীন, অযোগ্য শাসক-প্রশাসকের জাতি হিসাবে। এ অবস্থা সামগ্রিকভাবে বাঙালি মুসলমানের যৌথ-চৈতন্যে বৈরি প্রভাব ফেলে। ঐসব কল্পিত বর্ণনাকে সত্যি মনে করে তাদের মধ্যে দেখা দেয় প্রচন্ড হীনমন্যতা। পঞ্চাশ বছরের মধ্যে সত্যিকার অর্থেই বাঙালি মুসলমানের মানসিক মেরুদন্ড ভেঙ্গে যায়। ভাষার রূপান্তরের সূত্রে ইতিহাসের ও বাঙালি মুসলমানের মনোজগতে এই যে বিকৃতি ঘটে যায় এখনো তার পরিপূর্ণ সংশোধন সম্পন্ন হয়নি।
সংস্কৃতির রূপান্তর
১৩১০ সালের ৪ঠা অগ্রহায়ন ‘মিহির ও সুধাকর’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় দীনেশচন্দ্র সেনের ‘মাতৃভাষা’ নামক একটি প্রবন্ধ। ওখানে দীনেশবাবু লিখেন: “মুসলমান হিন্দু সাহিত্য পাঠে–হিন্দু আচার-ব্যবহার শিক্ষায় ক্রমেই হিন্দু ভাবাপন্ন হইয়া পড়িবে; তাই বাঙ্গালা সাহিত্য সমন্ধে উদাসীন থাকা মুসলমানদের উচিত নহে।” অত্যন্ত মেধাবী, প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও প্রাজ্ঞ মানুষ দীনেশবাবু প্রায় একশ কুড়ি বছর আগে লক্ষ্য করেছিলেন সাহিত্য তথা বইপত্রে ভিন্নতর সংস্কৃতি উপস্থাপন ও তা পাঠের মধ্য দিয়ে একটা জাতির সাংস্কৃতিক স্বভাব বদলে যেতে পারে, ধীরে ধীর মরে যেতে পারে তার নিজস্ব সংস্কৃতি। বহুবছর পর এ বিষয়ে সচেতন হয় বিভিন্ন উপনিবেশের মানুষেরা। বইপত্রে, শিক্ষাদীক্ষায় ভিন্ন ধারার জ্ঞান, মূল্যবোধ, ইতিহাস ও সংস্কৃতি উপস্থাপনের মাধ্যমে একটা জাতির মগজ দখল করার এই প্রক্রিয়াটাকেই বলা হয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। পৃথিবীর প্রাক্তন উপনিবেশগুলোয় এ কায়দাটাই প্রয়োগ করেছিল উপনিবেশী শক্তি। এ নিয়ে এখন বিস্তর লেখালেখি, তত্ত্ব দাড়িয়ে গেছে। তার বহু আগে দীনেশবাবু সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের এই চোরা ¯্রােতের দিকে ইঙ্গিত করে সতর্ক করেছিলেন সমকালীন মুসলমানদের। বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানজগত যে অবস্থায় পৌঁছার পর দীনেশ বাবু সতর্কবাণী জারি করেন সেই মাত্রায় পতনেরও একটা ইতিহাস আছে। সেটি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, বাংলা গদ্য এবং বিদ্যালয় ও বিদ্যালয়ের বাইরে পাঠ্য বইপত্রের সাথে শক্ত করে জড়ানো।
উনিশ শতকের আগ পর্যন্ত বাঙালির সাংস্কৃতিক চর্চার জগতে লিখিত বইপুস্তকের খুব একটা ভূমিকা ছিল না। মূলত চোখে দেখে শিখা ও আর মুরুব্বিদের কাছে শুনে শুনে জানার মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির শিক্ষা সম্পন্ন হতো। খুব ছোটোবেলা থেকে পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা, এরপর আশাপাশের মানুষ স্বাভাবিক জীবন যাপনের মধ্যেই সংস্কৃতির চিহ্নগুলো শিখিয়ে দিতেন নতুনদেরকে; তাও সংস্কৃতি নামে না, জীবনের আনন্দউল্লাস আচার-প্রথা হিসাবে। হাতে লেখা বই পড়ে শোনানোর একটা রেওয়াজ ছিল সে আমলে। যারা পড়ে শোনাতের তাদেরকে বলা হতো কথক। মাঝে মধ্যে কথকদের মুখে শোনা ঐসব কাহিনি সংস্কৃতি চর্চায় খুব একটা ছাপ ফেলতে পারতো বলে মনে হয় না। মোট কথা আজকের দিনে সংস্কৃতি পরিভাষায় যে বিস্তৃত পরিসরের চর্চার একটা বিষয় তৈরি হয়েছে তখন তার জায়গাটা ছিল অনেক ছোটো এবং জীবনযাপনের অংশ হিসাবেই তা রপ্ত হতো।
উনিশ শতকের শুরুতে ইংরেজের নির্দেশে পন্ডিতদের হাতে বাংলা গদ্য তৈয়ার হওয়ার পর বই পুস্তক লেখা ও ছাপা হতে থাকে। অচিরেই বাঙালির ছাপাখানাও বসে। নতুন কায়দায় স্কুল প্রতিষ্ঠা হয়, স্কুল বুক সোসাইটি এবং স্কুল সোসাইটি গড়ে উঠে। দুইতিন দশকের মধ্যে পড়াজানা বাঙালির জীবনের নতুন অনুসঙ্গ হয়ে উঠে ছাপার বই। বই থেকে শিখার ব্যাপারটা আগে ছিল কেবলই সংস্কৃত ব্যবসায়ী ব্রাহ্মণ ও মোল্লা মৌলভীদের মামলা। ছাপা বই হাতের কাছে আসার পর বইয়ের পাঠ থেকেও যে শিখা যায় এবং শিখতে হয় এই ধারণা জায়গা করে নেয় সাধারণ মানুষের মধ্যে। এবং এখান থেকেই বাঙালির সংস্কৃতিতে বইয়ের ভূমিকার সূচনা।
আদি মধ্যযুগে মানুষের জানার পরিধি ছিল সীমিত। আধুনিকযুগে তা বহুবিস্তৃত। আধুনিক মানুষ ছাপা পৃষ্ঠার প্রতীক ও সংকেতের মধ্য দিয়ে অনেক কিছু জানতে পারে। সাধারণের সমাজে এ ধরনের জানার সূচনা হয় লেখা ছাপার কৌশল আবিষ্কৃত হওয়ার পর। ভারতে তার আরম্ভকাল আঠার শতকের শেষে। বাংলা বই ছাপা শুরু হয় একেবারে শেষদিকে। এই সুযোগে বাঙালি বই পড়ে দেখার জগতের বাইরে আরো বিচিত্র ভিন্ন ভিন্ন জগত ও জীবন কল্পনায় দেখতে পায়। পাঠের মাধ্যমে মনে মনে দেখা সেই জগতে মানুষ আছে, জীবন ও তার যাপন আছে। সেই জীবনেরও আচার প্রথা আছে, আনন্দ-উল্লাসের জন্য কিছু কিছু তৎপরতা আছে, সৃজনশীলতা আছে; যেগুলোকে আধুনিক কালে একত্রে সংস্কৃতি নামে ডাকা হয়, তার সবই সেখানে আছে। তাই নিজের জীবনের চচির্চত সংস্কৃতি আর পাঠের জগতের সংস্কৃতির তুলনা করার ও প্রয়োজনে পাঠের জগতকে অনুকরণের বাসনা দেখা দেয় তার মধ্যে। সংস্কৃতির বোধ গড়ে তোলা ও চর্চা করার কাজে লেখা-পাঠ তথা বইয়ের ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হয়। উনিশ শতকের শুরু থেকেই নতুন বাংলায় লেখা নতুন ধরণের রচিত বইপত্রের মাধ্যমে উপস্থাপিত পাঠের জগতের নানা উপাদান বাঙালির জীবনে জায়গা করে নিতে থাকে, যা আসলে তার ঐতিহ্যিক সঞ্চয় নয়। এই পরিস্থিতির ব্যাপারেই বাঙালি মুসলমানদের সতর্ক করেছিলেন দীনেশচন্দ্র সেন। ততদিনের পার হয়ে গেছে সত্তর আশি বছরেরও বেশি সময়। বাঙালি মুসলমানের মনে, মননে ও জীবনচর্চায় যে-প্রভাব যতটুকু পড়ার কথা তা যথারীতি ঘটে গেছে। কি করে তা ঘটলো সে সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমরা এখানে হাজির করতে চাই।
প্রজাদের কাছ থেকে নানা কায়দায় অর্থ সংগ্রহ করে নিজের হিস্যা রেখে নির্ধারিত অর্থ রাজকোষে পৌঁছে দেয়ার ঝামেলার কাজটা করতো রাজস্ব সংগ্রহে জড়িত কর্মচারী-সামন্ত-জমিদাররা।মুসলমান কর্মচারীদের অবিশ^স্ততার কারণে রাজস্ব আদায়ে হিন্দু কর্মচারীদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন মুর্শিদ কুলি খান। এ ব্যবস্থা পরেও অব্যাহত থাকে। সিরাজ উদদৌলার সময় হিন্দুদের প্রাধান্য আরো বাড়ে। বৃটিশ দখলাদারিত্বের আগে আগে অর্থ ব্যবস্থা ও রাজস্ব ব্যবস্থার প্রায় পুরাটাই হিন্দু কর্মচারীদের হাতে উঠে গিয়েছিল। মুসলিম অভিজাত শ্রেণির অধিকাংশের আমিরানা চলতো মাসিক বেতন/বরাদ্দ/জায়গীর নানা তরফের উপহার উপটোকন ও অন্যান্য পাওয়া থেকে।
শাসন ক্ষমতা ইংরেজদের হাতে চলে যাওয়ার পর মুসলমানরা রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার জায়গাগুলো হারাতে থাকে ইংরেজদের সচেতন উদ্যোগে। সে জায়গা দখল করে উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা। এটি ছিল খুবই স্বাভাবিক পরিণতি। মুসলমানদেরকে পরাজিত করে ক্ষমতা নেয়ার কারণে বৃটিশরা তাদেরকে বিশ^াস করার কথা নয়। বর্ণ হিন্দু সমাজের প্রতিপত্তিশালী বেশ কিছু লোক পলাশির ষড়যন্ত্রের সহায়ক শক্তি হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে ইংরেজের বিশ^াস অর্জন করে নিয়েছিল শুরুতেই। ক্ষমতা পেয়ে তাদেরকে সহযোগী হিসাবে বেছে নেয় ইংরেজরা। ধীরে ধীরে মুসলিম অভিজাত শ্রেণি অর্থ ও ক্ষমতা দুই-ই হারায়। তাদের উপর নির্ভরশীল মুসলিম কর্মচারী-প্রজার দলের ভাগ্যের পতন ঘটে একই কারণে। রাজভাষা ফারসি চালু থাকায় কিছু সংখ্যক মুসলিম কর্মচারী এখানে সেখানে জায়গা নিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। ১৮০০ সাল নাগাদ অভিজাত মুসলমান ও সাধারণ মুসলিম প্রজা উভয় শ্রেণির বেশিরভাগ মানুষ রীতিমত দারিদ্রে পতিত হয়। শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা এবং এর সাথে জড়িত অন্যান্য বিষয়গুলোয় ব্যাপক রদবদলের ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছিলো এই আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পটভুমিতে ।
স্থানীয়দের সাথে সম্পর্ক যোজনে ইংরেজরা অভিজাত মুসলমান এবং উচ্চ বর্ণের হিন্দুদেরই প্রাধান্য দেয়। মুসলিম অভিজাতদের বেশির ভাগ ছিল উত্তরভারতীয় বংশোদ্ভুত হিন্দী/উর্দুভাষী। কিন্তু অভিজাত হিন্দুরা ছিল বাঙালি, বাংলাভাষী। সাধারণ শ্রেণির যেসব মানুষের উদ্যোগে বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা, গদ্যের চর্চা চলে আসছিল কয়েকশ বছর ধরে তারা ছিলেন রাজদরবার অথবা বিভিন্ন জমিদার সামন্তদের পৃষ্ঠপোষকতার উপর নির্ভরশীল। শিক্ষার জন্য ছিল মক্তব, টোল ইত্যাদি। বৃটিশদের শাসনের কয়েক দশকের মধ্যে এ সমস্ত কেন্দ্রই ভেঙ্গেচুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। নতুন শাসন কেন্দ্র, রাজস্ব আদায় কেন্দ্র, ব্যবসাকেন্দ্র ইত্যাদি গড়ে উঠে ইংরেজদের হাতে। সেখানে প্রাধান্য পায় ইংরেজদের সহযোগী উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা। যারা নবাবী আমল থেকে পদপদবি দখল করে বসেছিল তারা তো থাকেই, সঙ্গে যুক্ত হয় নয়া দোসরের দল। যারা বাংলা ভাষায় লেখতেন, সাহিত্য চর্চা করতেন বিদ্যালয় টোল মক্তব চালাতেন তারা মুছে যান দৃশ্যপট থেকে। এসব চলে যায় ইংরেজদের বেছে নেয়া নতুন বর্ণ হিন্দুদের দখলে। পরে এরাও যুক্ত হন কলিকাতাকেন্দ্রিক নয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাফেলায়।
এর মধ্যে কোলব্রুকস, হ্যালহেড জোনস প্রমুখের ভুল অনুমান ও সেই অনুমান নির্ভর বিশ্লেষণের বদৌলতে বাঙলাসহ ভারতীয় অন্যান্য ভাষার মা-বাপ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায় সংস্কৃত ভাষা। তারা এও ঘোণা করেন যে আরবফারসি শব্দসহ যে ভাষা প্রচলিত আছে তা মুসলমানী ভাষার শব্দদোষে দুষ্ট। বাংলা ভাষার উন্নতি করতে হলে সংস্কৃতকে আদর্শ ধরে, সংস্কৃতকে অনুসরণ করেই তা করতে হবে। এর মধ্যে বাংলাভাষার সে-যাবত কালের লেখকরা দৃশ্যপট থেকে পুরাপুরি অন্তর্হিত। ইংরেজরা মুসলমান অভিজাত শ্রেণি বলতে চিনতো উত্তরাভারতীয় উর্দুভাষী মুসলমানদের। এ কারণে তাদের ধারণা জন্মে অভিজাত মুসলমান যেহেতু বাংলা জানে না তাই বাংলা শিক্ষার কাজে মুসলমানদের নিয়োগ দেয়ার প্রশ্নই আসে না। আদতে অভিজাত শ্রেণি নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেই যে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ ধারা চর্চিত হয়ে আসছিল সে খবর তারা জানতো না, জানার প্রয়োজনও বোধ করেনি। ইংরেজ উদ্যোক্তারা বাংলা গদ্য লেখা ও শিক্ষকতার কাজের জন্য ইতিমধ্যে নানাসুত্রে সম্পর্কিত পন্ডিতদের ডেকে আনে, যারা বাংলা ভাষার লেখকও না,পৃষ্ঠপোষকও না। এ প্রক্রিয়ায় বাংলা গদ্য রচনা ও পড়ানোর কাজ থেকে সাধারণ হিন্দু-মুসলমান পুরাই বাদ পড়ে। এবং পরবর্তী ৫০/৬০ বছর পর্যন্ত তারা এ প্রক্রিয়ার বাইরেই থেকে যায়। তাই সে কালে বাংলা পাঠ্য পুস্তক বলি, সাধারণের পাঠ্য বই বলি, সংবাদপত্র বলি প্রায় সবই বর্ণ হিন্দুদের কর্ম। যেসব সাধারণ মুসলমান ও হিন্দু কবি, কবিয়াল, পাঠক লেখক ছিল তারা জ্ঞান উৎপাদনের এ মহাযজ্ঞে কোনা জায়গা পায় নাই। ফলে বাঙালির সাংস্কৃতিক ও ভাব জগতের ঐতিহ্যিক চর্চা নয়ারীতির জ্ঞানচর্চা ও বইপত্রে জায়গা না পেয়ে ঐতিহ্যিক প্রকাশরীতিতেই অস্তিত্ব রক্ষা করে চলে। । দীর্ঘদিন মৌখিক রীতিতে টিকে থেকে পরে ধীরে ধীরে লেখার জগতে প্রবেশ করে বাঙালির সবচেয়ে সমৃদ্ধ সে ভাবফসল, তাও ‘লোক’ শব্দে নির্দেশিত ‘নিচু-মান’-এর মার্কা নিয়ে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ পূর্ব্ববঙ্গ গীতিকা।
মুদ্রিত লেখাকে কেন্দ্র করে জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্যচর্চার এই ধারায় যারা নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাদের সবাই টোলে পড়া সংস্কৃত পন্ডিত। বেদাদি, রামায়ন, মহাভারত, পুরাণ, উপনিষদ, সুক্ত নিরুক্ত ইত্যাদিতে মহা পন্ডিত একেকজন। আবার বাঙলা ঠিকঠাক মতো জানেন না। আবার ইংরেজ প্রভুরা বলছেন সংস্কৃত ভাষা সব ভাষার মা-বাপ। তারা তাই সংস্কৃতের আদলে বাংলাকে রূপান্তরিত করে নয়া বাংলা ভাষায় বইপত্র লেখা শুরু করলেন। রচনার বিষয়বস্তুতেও তাদের জানাবুঝার ছাপ পড়ে। ঐসব সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতের জানাবুঝার জগত হলো সংস্কৃত ব্যাকরণ, রামায়ন মহাভারত, হিন্দু ধর্ম সংক্রান্ত বইপত্র, হিন্দু দেবদেবীর উপাখ্যান ইত্যাদি। তাই মাকাল গাছে আম ধরে না, মাকালই ধরে শেষপর্যন্ত; আগেও উল্লেখ করেছি পন্ডিতদের হাতে যেসব বই রচিত হয় তার প্রায় সবই আর্য পুরান কাহিনি, আর্য লোক আখ্যান, পুজার্চনা ইত্যাদি সম্পর্কিত। বাংলা সাহিত্য চর্চায় এই শ্রেণির সংস্কৃত পন্ডিতদেরই যে প্রাধান্য চলছিল অন্তত উনিশ শতকের প্রথম অর্ধেক পর্যন্ত সে খবর জানা যায় জেমস লঙের এই মন্তব্য থেকে: “বর্তমানে বাংলা সাহিত্যে যারা অগ্রণীর ভূমিকা পালন করছেন, যারা এখন বাংলা ভাষার ধারক ও বাহক, তারা হলেন ইংরেজি থেকে ভাবসম্পদ আহরণ করার মত পর্যাপ্ত জ্ঞানসম্পন্ন সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতবর্গ।” এই সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতবর্গের তৈরি মৃত্যুঞ্জয়ী বা সংস্কৃতানুযায়ী বাংলায় রচিত পাঠ্য পুস্তক বিদ্যালয়গুলোর মাধ্যমে সারা দেশের পড়–য়াদের বাধ্যতামূলকভাবে গেলানো হয়। সে তক বই পত্র বলতে হিন্দু ধর্মীয় বইপত্র, দেবদেবীদের আখ্যান, ধর্মীয় লোক আখ্যান, প্রাচীন হিন্দু রাজাদের বেডাগিরির কাহিনি, এবং প্রতাপাদিত্যের মতো আধাকাল্পনিক নায়ক চরিত্র নিয়ে লেখা বইপত্রই ছাপা হয়, পৌঁছে যায় বিদ্যালয়গুলোতে, পড়ায় আগ্রহী সাধারণ মানুষের হাতে হাতেও।
প্রথমে ইংরেজদের উদ্যোগে, পরে উচ্চশ্রেণীর হিন্দুদের সক্রিয় অংশগ্রহণে শিক্ষার যে ব্যবস্থা চালু হয় সেখানে ঐসব বইপত্রই পড়ানো হতো। এটি ছিল নামে সেকুলার, স্বভাবে বৃটিশ-আর্য শিক্ষা ব্যবস্থা। এসব কারণে মুসলমান বহুদিন সেই শিক্ষা প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে ছিল। তাদের পড়াশোনার একমাত্র সুযোগ ছিল স্থানীয় মক্তব মাদ্রাসা হয়ে কলিকাতা মাদ্রাসায়। তা অনেকের সাধ্যের মধ্যে ছিল না। তা ছাড়া মাদ্রাসায় দেশজ শিক্ষার সুযোগও তখন কমে যায়। সে তুলনায় বিদ্যালয়গুলোতে পাঠ নেয়া সহজ ছিল। কিন্তু সেখানে ভিন্ন সংস্কৃতি অর্থাৎ উত্তর ভারতীয় আর্য সংস্কৃতি ও ভিন্ন ধর্মের চর্চা। এবং এর ভাষাও নতুন, রীতিমত কষ্ট করে শিখতে হয়। তাই বহুবছর এ শিক্ষা থেকে দূরেই সরে থাকে মুসলমানরা। এর ফলে আর্থিক সুবিধাদি ও সামাজিক ক্ষমতা কাঠামো থেকেও তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে এবং ক্রমশ পিছিয়েই পড়তে থাকে। এক পর্যায়ে এসে উপায়ান্তর না দেখে তাদের ছেলেমেয়েদেরকে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাতেই অংশ নিতে পাঠায়।
শুধু বিদ্যালয় নয়, এর বাইরেও পড়ার মালমশলা বলতে ছিল মূলত ঐসব বইপত্র। বিভিন্ন সময়ে ছাপা বইয়ের মধ্যে হিন্দু ধর্ম ও পুরান দেবদেবীর আখ্যান ইত্যাদি বইয়ের প্রাধান্যের উল্লেখ করেছি আমরা একটু আগেই। ১৮২০ সালে ছাপা বইয়ের মধ্যে এ জাতীয় হিন্দু ধর্মাশ্রিত বইয়ের সংখ্যাই বেশি। নাম শুনলেই এসব বইয়ের বিষয়বস্তু ও অভিমুখ আন্দাজ করা যায়। যেমন: করুণা বিধান বিলাস, পদাঙ্ক দূত, বিশ^মঙ্গল, নারদ সংবাদ, গীতগোবিন্দ (সবকটি কৃষ্ণ বিষয়ক), চন্ডী অন্নদামঙ্গল, গদা ভক্তি (শিব-গঙ্গা বিষয়ক), চৈতন্য চরিতামৃত, রসমঞ্জরী পাদবলী, রতিবিলাস, রতিকাল, তোতা ইতিহাস, বত্রিশ সিংহাসন (হিন্দু ধর্মীয় রাজার উপাখ্যান), চানক্য শ্লোক, হিতোপদেশ। এর বাইরে ব্যাকরণ, সঙ্গীত, জ্যোতিষবিদ্যা, চিকিৎিসাশাস্ত্র বিষয়ে অল্প কয়টা বই বের হয়। । ১৮২২ সাল থেকে ২৬ সালের মধ্যে প্রকাশিত ২৭টি বইয়ের নাম উল্লেখ করেছেন জেমস লঙ। এসব বইয়ের মধ্যে প্রায় সবই হিন্দু ধর্মাশ্রিত রচনা। যেমন দিন কৌমুদী: হিন্দু ধর্মমতে বিশেষ বিশেষ দিন পালন করার বিষয়ে, আনন্দ লহরী:হিন্দু ধর্মের দেবী দূর্গার মাহাত্ম্য বিষযক বিবরণ, তর্পণ: হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মৃত্যুর পর সৎকারের রীতিনীতি , রাধিকা মঙ্গল: রাধার গুণকীর্তন ও রূপ বিবরণ, গঙ্গাভক্তি তরঙ্গিণী: গঙ্গা বিষয়ে, পদাঙ্ক দূত: হিন্দু দেবতা শ্রীকৃষ্ণের পদচিহ্ন নিয়ে, বত্রিশ সিংহাসন: রাজা লোক উপাখ্যানের রাজা বিক্রমাধিত্যের কাহিনি, নারদ সংবাদ: শ্রীকৃষ্ণ সংক্রান্ত শ্লোক নিয়ে রচিত। এই শেষ নয়। ন্যায় হিন্দু ধর্মদর্শন বিষয়ে রচিত বই। রাধার সহ¯্র নাম, ভগবতীর সহ¯্র নাম ও বিষ্ণুর সহ¯্র নাম বই তিনটি সংশ্লিষ্ট দেবদেবীর নাম মাহাত্ম্যের বিবরণ। দেবদেবীর সহস্ত্র নাম উল্লেখ করে বই লেখার ধারণা মাথায় আসে সম্ভবত মুসলমানদের আল্লাহ্র শত নামের উল্লেখ থেকে। নলদময়ন্তী: এ বইয়ের বিষবস্তু নল ও দময়ন্তীর প্রেম কাহিনি। কিন্তু সেই কাহিনির পুরোটা জুড়ে দেবতা ইন্দ্র, বরুন, অগ্নি, যম এদের উপস্থিতি। কলঙ্কভঞ্জন: এ বইটিও শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে লেখা।, প্রাণ তোষণ শিরোনামের এ বই হিন্দুদের প্রায়শ্চত্তি বিষয়ে রচিত। সঙ্গীত তরঙ্গিণী হিন্দু ধর্মীয় সঙ্গীত সংক্রান্ত। ২৭টি বইয়ের মধ্যে ১৫টিই সরাসরি হিন্দু ধর্ম বা দেবদেবী বা পুরাণ সংক্রান্ত। অন্য বইগুলোও হিন্দু ধর্মমতে জগত ও জীবন সম্পর্কিত নানা বিশ^াস, বিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ে রচিত। তিনটা বই বাদে সবই হিন্দু ধর্ম সম্পর্কিত। এই তিনের একটি ছিল পঞ্জিকা, আরেকটি সংস্কৃত অভিধান। জেমস লঙ লিখেছেন “১৮২০ সালে নি¤েœাক্ত বিষয়ে ৩০টি বাংলা বই প্রকাশিত হয়েছিল। এর মধ্যে ৫টি কৃষ্ণ-বিষয়ক, ২টি বিষ্ণু -সম্পর্কিত, ৪টি দূর্গা-বিষয়ক, ৩টি উপাখ্যান, ৫টি আদিরসাত্মক, এবং একটি করে স্বপ্ন, সঙ্গীত, জ্যোতিষশাস্ত্র, চিকিৎসা-বিষয়ক গ্রন্থ, এবং রামমোহনের অনুবাদ ও পঞ্জিকাসমূহ ( পরিশিষ্ট ঘ দ্রষ্টব্য)। ১৮২২ সাল থেকে ২৬ সালের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে ২৮টি গ্রন্থ। এদের মধ্যে তিনটেকে বাদ দিলে বাকী সবই পৌরিণিক কাহিনি অথবা উপন্যাস। এ ধারতেই পুস্তক প্রকাশনার কাজ এগিয়ে চলে ১৮৫০ সাল পর্যন্ত”। লঙ ১৮৫০ সালের কথা বললেও বাস্তবে বাংলা বইপত্র লেখা ও প্রকাশনায় হিন্দু ধর্মাশ্রিত ও পৌরাণিক কাহিনির প্রাধান্য ছিল আরা বহুদিন। ১৮৫৭ সালে বই প্রকাশিত হয় ৩২২টি। লঙের বিবরণ থেকে বোঝা যায় এর মধ্যে ৪০ শতাংশের বেশি হিন্দু ধর্মাশ্রিত রচনা। বাস্তবে আরো দুইতিন দশক এ অবস্থাই অব্যাহত থাকে, যে পর্যন্ত না মুসলমান লেখকরা মৃত্যুঞ্জয়ী সংস্কৃতায়িত বাংলা শিখে লিখতে শুরু করে।
তবে খানিকটা দেরিতে হলেও উনিশ শতকের সূচনাতেই লেখালেখিতে সম্পৃক্ত হয় বাঙালি মুসলমান। উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের পরের সময় থেকে মুসলমান লেখকদের বইপত্র প্রকাশিত হওয়া খবর জানতে পারি আমরা। এ সময়টা ছিল রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি সবক্ষেত্রে বড়সড়ো পরিবর্তন চলাকালীন মাঝ বরাবর এক যুগ। মুসলিম শাসনামলে যারা অর্থবিত্ত ও ক্ষমতার ধারক ছিলেন তাদের বেশিরভাগ ছিলেন উত্তরভারতীয় অবাঙালি মুসলমান। এরাই ছিলেন মুসলিম জনগোষ্ঠীর নেতা। অন্যদিকে, হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় উচ্চবর্ণের হিন্দুরাও উত্তর ভারত থেকেই আসেন। বিশেষত সেন আমলে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বহু ব্রাহ্মণ পরিবার বাংলায় বসবাস করতে আসেন। এরপরও অনেক উচ্চবর্ণের হিন্দু বাংলাদেশে বসতি করেন। এরমধ্যে পার হয়ে গেছে কয়েক শতাব্দি। এই সময়ের মধ্যে তারা বাংলাদেশের জনসমাজ, প্রকৃতি ও আবহাওয়ার সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। সে তুলনায় মুসলিম উচ্চবিত্তরা ছিলেন এদেশে নবীন। কেউ কেউ মাত্র কয়েক পুরুষ আগে এদেশে এসেছেন। ভাষায়, আচারআচরণে জীবনযাপনের অভ্যাসে তারা তখনো উত্তরভারতীয় স্বভাব ধরে রাখতেই উৎসাহী। এরা তখন বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে। স্থানীয় যেসব বাঙালি মুসলমান কিছুটা প্রভাব প্রতিপত্তির অধিকারী ছিলেন তারাও ঐসব উত্তর ভারতীয় মুসলমানদের চাপের মুখে নিজস্ব মতামত প্রকাশ ও প্রচারের খুব একটা সুযোগ পেতের না। উপনিবেশ কায়েম হওয়ার আগে আগে হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বের মধ্যে এই ফারাকাও পরবর্তীকালে শিক্ষা শিল্পসাহিত্যে মুসলিমদের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ।
হিন্দু জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে থাকা উচ্চশ্রেণীর হিন্দুরা বাংলাভাষী হওয়ার কারণে বৃটিশদের বিশেষ আনুকূল্য পেয়ে যখন উৎসাহ উদ্দীপণা নিয়ে সংস্কৃতায়িত বাংলায় শিক্ষাগ্রহণ ও সাহিত্যচর্চায় মন দেয় তখন নিজেদের উর্দু ভাষা ও উত্তরভারতীয় মুসলিম সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে থাকে মুসলিম জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে থাকা অবাঙালি মুসলিম সমাজ। কারণ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে তাদের রক্তের টান ছিল না। তাছাড়া সদ্য ক্ষমতা হারানোয় ইংরেজদে প্রতি ক্ষোভ ও ঘৃণা বোধও ছিল বিচ্ছিন্নতার অন্যতম এক কারণ। এ অবস্থায় উপনিবেশের সূচনায় সাধারণ বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠী ছিল প্রকৃত অর্থেই নেতৃত্বহীন, আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত। একদিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাঙালি জনগোষ্ঠী নতুন ধাঁচের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে চাকরীবাকরি করছে আর নতুন ধরণের সংস্কৃতায়িত বাংলায় সাহিত্য চর্চা করছে, আর অন্যদিকে নেতৃত্বহীন, দ্বিধান্বিত মুসলিম ধর্মাবলম্বী বাঙালি জনগোষ্ঠী । উনিশ শতকের শুরুর দিকে জমিদারী, ব্যবসাবানিজ্য, রাজকীয় চাকরীবাকরী হারিয়ে তাদের নেতারাও পর্যুদস্ত। এ অবস্থায় সাধারণ বাঙালি মুসলমানরা অনেকটা পুরোনো ধারার জীবন যাপন করছিল। এদের বেশিরভাগই উপনবিশের কেন্দ্রগুলো থেকে দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষ। উপনিবেশী ইংরেজদের উদ্যোগে বা উৎসাহে সূচিত নতুন ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থা ও বিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগই কলিকাতা, শ্রীরামপুর, চুঁছরা প্রভৃতি উপনিবেশী কেন্দ্রগুলোর আশপাশে খোলা হয়। সাধারণ বাঙালি মুসলিম প্রজারা তখনো এই শিক্ষাব্যবস্থা ও বিদ্যালয়গুলির গন্ডির বাইরে। এইসব সাধারণ মুসলমানদের ঐতিহ্যপন্থী লেখকরা তখনো পুরানো ধারায় সাহিতচর্চা করছিলেন। তাদের ভাষা ছিল সাধারণ বাঙালির কথ্যভাষা, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যেটাকে বলেছেন ‘বিষয়ী লোকের ভাষা’; যে ভাষায় আরবী ফারসি ও সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিন্তু ততদিনে মৃতুঞ্জয়ী সংস্কৃতায়িত বাংলা কলিকাতার ভদ্রলোকদের মধ্যে প্রচলিত হয়ে যায়। কথ্য বাংলায় সংস্কৃতের পাশাপাশি আরবী ফারসি শব্দ থাকার কারণে তারা পরিকল্পিতভাবেই সে ভাষাকে নিশ্চিহ্ন করার সমস্ত কৌশলই প্রয়োগ করতে থাকে। এরই অংশ হিসাব কলিকাতার লেখিয়েরা কথ্যবাংলায় রচিত এই সব বইপত্রে আরবী ফারসি শব্দ ও বাগবিধির উপস্থিতির অজুহাতে এগুলোকে আরবী ফারসির দোষে দুষ্ট হিসাবে চিহ্নিত করে। পরে আসল কথ্য বাংলায় লেখা এ সব বইপত্রের ভাষাকে মুসলমানী বাংলা নাম দিয়ে একেবারেই আলাদা করে ফেলা হয়। এ কাজের যৌক্তিকতা তৈরি হয় দুই দিক থেকে। এক: এরইমধ্যে হিন্দু বাঙালিরা মধ্যযুগীয় রীতির লেখালেখি ছেড়ে ফোর্ট উইলিয়ামের সংস্কৃতায়িত বাংলায় লেখালেখিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠে; ফলে তাদের পুরোনো ধারার কাব্যচর্চার ইতি ঘটে। দুই: নতুন ধাঁচের পড়াশোনার বাইরে থাকায় এবং সংস্কৃতায়িত বাংলায় অনভ্যস্ত হওয়ার কারণে সাধারণ মুসলমানরা পুরানো ধারায় কিছু কিছু সাহিত্য চর্চা বজায় রেখে চলছিলা। উনিশ শতকের তৃতীয়ার্ধ্বের শেষ বা চতুর্থ দশকের শুরুতেই আমরা মুসলমান লেখকদের লেখা বইপত্রের খবর পাই। এসময় কাকতালীয়ভাবে, অনেক মুসলমান লেখক যেন বা জোর করে প্রচুর আরবী-ফারসি শব্দ ঢুকিয়ে এমন এক ভাষায় সাহিত্য চর্চা করতেন যাকে বাংলা ভাষা না বলে মিশ্র ভাষা বলাই যৌক্তিক। এ যেন মৃত্যুঞ্জয়ী বাংলার ঠিক উল্টোটা, হয়তো এর প্রতিক্রিয়াতেই সৃষ্ট। মৃত্যুঞ্জয়ী বাংলারীতিতে যেমন খুব বেশি সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার, এ ভাষায়ও তেমনি মাত্রাতিরিক্ত আরবী-ফারসী শব্দের প্রয়োগ। কিন্তু পত্রপত্রিকা, স্কুল, পাঠ্যসূচী নির্ধারণের ক্ষমতা, মুদ্রণযন্ত্র ইত্যাদি হাতে থাকার কারণে কলকাতা কেন্দ্রিক হিন্দু বাঙালিরা মৃত্যুঞ্জয়ী সংস্কৃতায়িত বাংলাকেই আদর্শ বাংলা রীতি হিসাবে প্রতিষ্ঠত করতে সক্ষম হয়। মুসলমানদের সেই সুযোগ ও সক্ষমতা ছিল না। আবার মাত্রাতিরিক্ত আরবী ফারসি শব্দবহুল মিশ্র ভাষার সংখ্যাল্প কিছু রচনার বৈশিষ্ট চাপিয়ে দেয়া হয় সাধারণের কথ্য ভাষায় লেখা অন্যান্য রচনার উপর। ফলে মুসলমানদের সকল রচনাকেই ঢালাওভাবে আরবীফারসি দোষে দুষ্ট হিসাবে চিহ্নিত করে নি¤œরুচির সাহিত্য, বটতলার সাহিত্য ইত্যাদি মার্কা লাগিয়ে দেয়া সহজ হয়। এই কথ্যবাংলাকে বলা হয় মুসলমানী বাংলা, আর এভাষায় রচিত সাহিত্যকে বলা হয় মুসলমানী বাংলা সাহিত্য।
খুব সম্ভবত জেমস লঙ-ই প্রথম ব্যবহার করেন এ পরিভাষাটি। পরে দীনেশচন্দ্র সেন, সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেনও এই নামটিই ব্যবহার করেন। ক্রমশ তা চালু হয়ে যায়। বাঙালি মুসলমানদের রচিত এসব কাব্যসাহিত্যকে ‘পুঁথি সাহিত্য’, ‘দোভাষী সাহিত্য’, ‘বটতলার বই’ ইত্যাদি নামে আলাদাভাবে নি¤œমানে চিহ্নিত করার পেছনে যৌক্তিক ভিত্তি কতটুকু আমরা নমুনা সহকারে যাচাই করে দেখতে চাই। এক্ষেত্রে মৃত্যুঞ্জয়ী সংস্কৃতায়িত বাংলা তৈরির আগের বাংলাগদ্যের নমুনাকে মান ধরে দুই শ্রেণির রচনার তুলনা করা যেতে পারে। তবে এমন গদ্যের নমুনা নেয়া দরকার যার মধ্যে ধর্মীয় পরিপাশের্^র কোনো প্রভাব থাকার সম্ভাবনা না থাকে। যেমন বৈষ্ণব সহজিয়া সাধকদের গদ্যরচনা কিংবা হিন্দু বা ইসলমা ধর্ম সংক্রান্ত কোনো আলোচনার গদ্যে ধর্মীয় প্রভাব থাকা স্বাভাবিক। তেমনি আদালতের চিঠিপত্রে থাকতে পারে অতিরিক্ত ফারসির প্রভাব।হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছেন হিন্দু ধর্মশাস্ত্র সম্পর্কি ব্যবসায়ী এবং আদালত আমির ওমরাহদের ভাষার বাইরে বিষয়ী লোকেরা একরকম ভাষা ব্যবহার করতেন, সেটিই সাধারণ মানুষের কথ্যবাংলা। তা কিন্তু কোনো নিদিষ্ট অঞ্চল বিশেষের ভাষা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে কাজের গদ্য লেখার ও সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে তার একটা মান রূপ দেখা দেয়। সেই ভাষায় পরিমাণ মতো সংস্কৃত আরবী ফারসি মিশে সুললিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ ভারসাম্যময় ভাষা হিসাবে বিকশিত হয়েছিল। আমরা এখানে সেরকম বিষয়ী লোকের পত্রের অংশ বিশেষ তুলে ধরবে। নারায়নপুরের আড়ঙ্গের গোমস্তা নালিশ জানিয়ে চিঠি লিখছে ঢাকার কুঠিকে:
আড়ঙ্গ নারায়নপুরের শ্রীবিন্দুমোহন তাঁতি নালিষ করিলেন জমীদার অন্যায় করিয়া পাট্টা বেসী খাজনা তাতির স্থানে লইতেছে (।) অতএব আরজ তাতি মজকুর আরজী সমেত জাইতেছে () জোনাবে পৌছিয়া আরজ করিবেক (।) তাহাতে গৌর ফরমাইতে হুকুম হইবেক (্) ইহা কদমে আরজ করিলাম। ইতি সন ১৯৯ সন ইং ১৭৯২ তারিখ ১৪ দিজস্বর–২ পৌষ ।
চিঠির উদ্ধৃত মূল অংশটিতে ৩৫টি শব্দ আছে। এর মধ্যে শতকরা হিসাবে প্রায় ৫৫% বাংলা, ৩৪% আরবী ফারসি, ১২%-এর মতো সংস্কৃত বা সংস্কৃতজাত শব্দ।
এবার একটি ব্যক্তিগত চিঠি উদ্ধৃত করা যাক। চাকরি পাওয়ার জন্য তদবিরের চিঠি লিখেছেন কেউ একজন:
“ সন ১১৯৯ সাল (১৭৯২)।
আমী. . . তোমার নিকট জাইতেছিলাম (।) নদীর বন্যাতে পার হইতে পারিলাম না (।) জাইতে পারিলে সাক্ষাতে সকল কহিথাম (।) শ্রীযুত বাহড় খাঁএর ভাড় বেলপোড়া ইজারা হইয়াছে (।) প্রাণতুল্য দেবী প্রসাদ রায়ের খিদমৎ এক জায়গাতে কিম্বা মহুরির গিরি খাঁ মজকুরের নিকট করিয়া দিতে হইবেক (।) খাঁ মজকুর তোমার বষের মধ্যে বটেন, তোমার আমী পোষ্যের মধ্যে বটি (।) মহুরিরগিরি হয় এর এতমাম হয় ইহা করিয়া দিতে হইবেক…।”
এ উদ্ধৃতিতে শতকরা হিসাবে প্রায় ৭৯% বাংলা, ৯% সংস্কৃত, ১৩ % আরবী ফারসি। দৃই উদ্ধৃতির গড় করলে দাড়ায়: ৬৯% বাংলা, আরবি-ফারসি ২১%, ১০% সংস্কৃত বা সংস্কৃতজাত।
এবার সংস্কৃতায়িত বাংলা থেকে উদাহরণ দেয়া যাক:
এইরূপে, আমি, সর্বক্ষণ, তোমার অদ্ভুত মনোহর মূর্ত্তি ও নিরতিশয় প্রীতিপ্রদ অনুষ্ঠান সকল অবিকল প্রত্যক্ষ করিতেছি; কেবল, তোমায় কোলে লইয়া , তোমার লাবন্যময় কোমল কলেবর পরিস্পর্শে, শরীর অমৃতরসে অভিসিক্ত করিতে পারিতেছি না। দৈবযোগে, একদিন, দিবাভাগে আমার নিদ্রাবেশ ঘটিয়াছিল। কেবল, সেই দিন, সেই সময়ে, ক্ষণকালের জন্য, তোমায় পাইয়াছিলাম।
এখানে বাংলা ৬৫%, ৩৫% সংস্কৃত বা সংস্কৃতজাত, আরবী ফারসি ০%।
“সায়াহ্নকাল উপস্থিত, পশ্চিমগগনে অস্তাচলগত দিনমণির ম্লান কিরণে যে সকল মেঘ কাঞ্চণকান্তি ধারণ করিয়াছিল, তৎসহিত নীলাম্বরপ্রতিবিম্ব ¯্রােতস্বতীজলমধ্যে কম্পিত হইতেছিল; নদী পাড়স্থিত উচ্চ অট্টালিকা এবং দীর্ঘ তুরুবর সকল বিমলাকাশপটে চিত্রবৎ দেখাইতেছিল; দূর্গমধ্যে ময়ূর সারসাদি কলনাদী পক্ষিগণ প্রফুল্লচিত্তে রব করিতেছিল; কোথাও রজনীর উদয়ে নীড়ান্বেষনে ব্যস্ত বিহঙ্গম নীলাম্বরতলে বিনা শব্দে উড়িতেছিল”।
এ উদ্ধৃতিতে বাংলা শব্দ খুঁজেপেতে বের করতে হয়। প্রায়ই সবই সংস্কৃত বা তদ্ভব দশব্দ।
এবার আমরা ‘দোভাষী কাব্য’, ‘মিশ্রভাষার কাব্য’, ‘পুঁথি সাহিত্য’, ‘মুসলমানী বাঙলা’ ইত্যাদি নামে অস্পৃশ্য করে রাখা সাহিত্য থেকে নমুনা তুলে দেই:
কেতাব করিল মর্দ্দ ফারসি জবানে।
ফারসি লোক যারা তার খুশি হাল শুনে॥
বাঙ্গালার লোক সবে নাহি জানে ভেদ।
যে কেহ শুনিল তার দেলে করে খেদ॥
এ খাতেরে ফকিরে হইল সওক।
আফছোছ না করে যেন বাঙ্গালার লোক॥
চলিত বাঙ্গালায় কিচ্ছা করিনু তৈয়ার।
সকলে বুঝিবে ভাই কারণে ইহার॥
আসল বাঙ্গালা সবে বুঝিতে না পারে।
এ খাতেরে না লিখিলাম সোন বেরাদরে॥
এখানে আরবি ফারসি শব্দ মোটের ২৩% প্রায়, সংস্কৃত ২%, বাকী ৭৫% বাঙলা শব্দ। আমরা একটু আগে মৃত্যুঞ্জয়ী সংস্কৃতায়িত বাংলা তৈয়ারের আগের বাংলা গদ্যকে মান ধরে যে হিসাব পেয়েছিলাম তাতে আরবী ফারসির পরিমাণ ছিল ২১%। এখানে ২% বেড়ে হয়েছে ২৩%। সংস্কৃত শব্দ ছিল ১০%-এর মত। এখানে সংস্কৃত শব্দ মাত্র ২%, কমেছে ৮%। বাংলা শব্দ ৬৯% থেকে বেড়ে দাড়িয়েছি ৭৫%-এ।
অন্যদিকে, মৃত্যুঞ্জয়ী বাংলায় সংস্কৃত শব্দ ৩৫%, অর্থাৎ উপনিবেশ-পূর্ব মান বাংলা গদ্যের তুলনায় ২৫% সংস্কৃত শব্দ বেড়েছে। আর আরবী ফারসি শব্দ সর্ম্পূণ অন্তর্হিত।
আমাদের প্রশ্ন হলো ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মৃত্যুঞ্জয়ী বাংলার পূর্ব পর্যন্ত কয়েকশত বছরের ঐতিহ্যে বিকশিত বাংলা ভাষার তুলনায় যেখানে আরবি ফারসি শব্দ বাড়েনি এবং সংস্কৃত শব্দ কমে বেড়েছে বাংলা শব্দ সেই ভাষাকে কোন যুক্তিতে ‘দোভাষী কাব্য’, ‘মিশ্রভাষার কাব্য’, ‘পুঁথি সাহিত্য’, ‘মুসলমানী বাংলা’ বলে খারিজ করে দেয়া হলো? এর জবাব খুঁজতে হবে বাংলা ভাষার উপনিবেশায়নের ইতিহাসে। উনিশ শতকে কলিকাতার আর্যত্ববাদী লেখকগণ নানা আবেগে চালিত হয়েছিলেন। এর মধ্যে ইউরোপীয় রেনেসাঁর অনুকরণে আর্য সংস্কৃতি ও ধর্মের পুনর্জাগরণের জোশ, ধর্মচর্চার ভাষা সংস্কৃতের প্রতি কওমি মমত্ব ইত্যাদি ভালো ভাবেই কব্জা করে নিয়েছিল তাদেরকে। উনিশ শতকের দৃশ্যপটে মুসলিম লেখকদের এমন কোনো প্রভাবশালী অবস্থান সৃষ্টি হয়নি যে তারা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এই ভাষিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মোকাবিলা করবে। উপনিবেশি শাসন অবসানের পর অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাংলাদেশের লেখকদের মধ্যে নতুন আবেগ উদ্দীপণার উন্মেষ হয় চল্লিশের দশক থেকে। এর ছাপ আমরা পাই ঐ দশকের সৃজনশীল সাহিত্যের ভাব ও উপাদানের দেশজ স্বাতন্ত্রে। একই ধরনের উচ্ছ্বাস চিন্তাশীল লেখকদের মধ্যেও লক্ষ্য করা গেছে। এসব কারণে উপনিবেশি শাসনের অবসানের পর বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক ব্রাহ্মণ্য আধিপত্য চিহ্নিত করার মত উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি ছিল আমাদের বুদ্ধিজীবীদের সামনে।
দুর্ভাগ্যের বিষয় পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জোশে লেখক-বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির স্বাধীনতার প্রশ্নটি সামনে না এনে বরং মুসলিম তমুদ্দনের স্পর্শে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে শুদ্ধ ও ‘ঋদ্ধ’ করার প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। ইসলামী সংস্কৃতির প্রশ্নে এদের অনেকের আবেগ ছিল মৌলবাদী–মূল ইসলাম ও আরবি ভাষার নিরিখে সংস্কৃতি ও ভাষাকে প্রয়োজনমত ‘পরিশুদ্ধ’ করে নেয়া। এদের গোঁড়ামি অতদূর পৌঁছে যে কেউ কেউ আরবি অক্ষরে বাংলা লেখার মত উদ্ভট ও চরম প্রতিক্রিয়াশীল প্রস্তাবও রেখেছিলেন। ধারণা করা যায় উনিশ শতকে কলিকাতার উচ্চ বর্ণের হিন্দু লেখক-বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা বাংলা ভাষার সংস্কৃতায়নের মধ্যে দৃশ্যমান ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রতিক্রিয়া হিসাবে পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশের ঐ শ্রেণির লেখকগণ সংস্কৃতের প্রভাব দূর করে আরবি-ফারসির রঙ চড়াতে চেয়েছিলেন বাংলা ভাষার গায়ে। বাংলার দেশাত্মা এদের অন্তরে স্থান পায়নি, জায়গা পেয়েছিল প্রথমত পাকিস্তানকেন্দ্রিক ভুল উচ্ছ্বাস ও স্বপ্ন। বঙ্কিমচন্দ্র ও তার ভাবানুসারীরা যেমন ভারতকে পৌরাণিক আদর্শের হিন্দুস্থান হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, তেমনি এদেরও মননে-স্বপ্নে ছিল একীভুত মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। এদের বুজপরামর্শ অতটাই বিভ্রান্ত, প্রতিক্রিয়াশীল ও ধর্মাশ্রিত যে এ নিয়ে আলাদা আলোচনা আপাতত দাবী রাখে না।
আমার পর্যবেক্ষণের লক্ষ্য পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে প্রগতিশীল বলে পরিচিত সেই সব বুদ্ধিজীবীদের তৎপরতা যারা বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ধারক-বাহক হিসাবে প্রতিষ্ঠা ও সম্মান পেয়েছেন। অত্যন্ত বিস্ময়কর যে, এদের কেউ বাংলা ভাষার উপর সংস্কৃতের আগ্রাসনের ব্যপারে টু শব্দটিও করেন নাই, প্রবীনতম ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছাড়া। একটা সমাজে বুদ্ধিজীবীর দায়িত্বের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো সে সমাজ, রাষ্ট্র বা সংস্কৃতির উপর যেকোনো বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যত্যয় বা আগ্রাসনের প্রতিবাদ করা এবং জনমানুষের স্বার্থে প্রয়োজনীয় পথের দিশা তুলে ধরা। তারা তা করেননি। বরং অনেকে কলিকাতার লেখকদের ব্যাখ্যা মেনে নিয়ে বাঙালির মান কথ্যবাংলার রচনাগুলোকে নি¤œমান-এর তকমা লাগিয়ে আলাদা করে রেখেছেন। ডক্টর আনিসুজ্জামান, আহমদ শরীফ, সৈয়দ আলী আহসান কিংবা মুহম্মদ আবুদল হাইয়ের মত লেখকেরাও কলিকাতার সংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণ পন্ডিতদের অনুসরণে এসব সাহিত্যকে ‘মিশ্রভাষার কাব্য’, ‘দোভাষী কাব্য’ ‘মুসলমানী সাহিত্য’ ইত্যাদি নামে নি¤œমানের সৃষ্টি হিসাবে চিহ্নিত করেন।
এখানে দ্বিতীয় প্রশ্নটি এসে যায় স্বাভাবিকভাবেই। সেটি হলো ঐতিহ্যিক মান কথ্যবাংলায় প্রায় ১০% সংস্কৃত শব্দের তুলনায় মৃত্যুঞ্জয়ী বাংলায় প্রায় ৩৫ % সংস্কৃত শব্দ চালিয়ে দেয়া সত্ত্বেও মৃত্যুঞ্জয়ী বাংলাকে ‘দোভাষী বাংলা’, ‘মিশ্রবাংলা’, ‘হিন্দু বাংলা’ কিংবা ‘সংস্কৃতবাংলা’ বলা হলো না কেন? বঙ্কিমের রচনা সবাইকে ছাড়িয়ে; অনেকক্ষেত্রে ৫০%-এর বেশি শব্দ সংস্কৃত। তা সত্ত্বেও মনে পড়ে না বঙ্কিমের গদ্যকে কেউ সংস্কৃত গদ্য বলেছেন, নিদেনপক্ষে বাংলা বলতে অস্বীকার করেছেন কিংবা অন্তত দোভাষী গদ্য বলেছেন, যদিও বঙ্কিম নিজে এ ভাষাকে বলেছেন ‘সংস্কৃতানুযায়ী বাংলা’। কেন? এ প্রশ্নের জবাবেই সুপ্ত হয়ে আছে আমাদের বর্তমান নিবন্ধের পর্যবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ ফল, যার সাথে জড়িয়ে আছে ভাব ও সংস্কৃতির আধিপত্যর (ঐবমবসড়হু) বিষয়। এ প্রসঙ্গে হেজেমনির ধারণা সম্পর্কে একটু বলে নেয়া দরকার।
ঐবমবসড়হু শব্দটি গ্রীক ঐবমবসড়হরধ থেকে বিবর্তিত হয়েছে, যা গ্রিসের নগর রাষ্ট্রগুলি কর্তৃক একে অপরের উপর আধিপত্য বুঝাত। উৎপাদন ও শ্রেণিসংঘাতের নিরিখে বিশ শতকের আধুনিক মানব সমাজের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এই ধারণাটাকে পরিবর্তিত ও বিস্তৃত করেন ইতালীয় মার্কসবাদী তাত্ত্বিক আন্তোনীয় গ্রামসি। হেজেমনির বাংলা পরিভাষা হিসাবে আমি ভাবাধিপত্য ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য দুটোই ব্যবহার করেছি। কারণ পরিভাষাটি নতুন হওয়ায় নিয়মিত ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ অর্থ আরোপিত হওয়ার প্রক্রিয়াটি এখানে সম্পন্ন হয়নি বিধায় কোনো একটা একক পরিভাষায় এর প্রকাশ জুতসই হয়ে উঠে না বলে মনে হয়েছে আমার। আমরা ভাবাধিপত্য কথাটা ব্যবহার করতে পারি, যদি ‘ভাব’-এর মধ্যে জ্ঞান ও সংস্কৃতির ধারণা যুগপৎ বুঝার প্রস্তুতি থাকে । যাইহোক, হেজেমনি বা ভাবাধিপত্য বলতে কোনো একটি দলের বা শ্রেণির উপর আরেকটি শক্তিশালী দল বা শ্রেণির বুদ্ধিবৃত্তিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বুঝায়। সাংস্কৃতিক ও বৃদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় ভাবাধিপত্য বলতে বোঝানো হচ্ছে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং একই উদ্দেশ্যমুখি একগুচ্ছ ধারণার আধিপত্য। এই আধিপত্য কায়েম হয় প্রভাবশালী শ্রেণির ধারণা, বুদ্ধি, জ্ঞান, সাংস্কৃতিক চর্চাকে মহত ও উন্নত হিসাবে দুর্বল শ্রেণিটি কর্তৃক সায় প্রদানের মধ্য দিয়ে। স্বেচ্ছায় প্রদত্ত এই ‘সায়’ও অর্জিত হয় কিছু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যে প্রক্রিয়ার বেশিরভাগটাই সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা সম্পর্কিত তৎপরতার সাথে জড়িত। ভাবাধিপত্যের দ্বিতীয় কাজটা হলো যেকোনো বিকল্প ধারণা প্রকাশকে যেকোন মূল্যে থামিয়ে দেয়া। অর্থাৎ বিকল্প মত বা তত্ত্ব উৎপত্তির রাস্তা অঙ্কুরে নষ্ট করা। আঠারো-উনিশ শতকের বাংলাদেশে ভাবাধিপত্য কায়েমের আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়ে গিয়েছিল আর সেই আধিপত্য জারি থাকার পরিবেশ বজায় রয়ে গেছে আজকের বাংলাদেশেও। এখানে সেই পরিস্থিতির সংক্ষিপ্ত একটা বিশ্লেষণ দেয়া প্রয়োজন মনে করি।
১৭৫৭ সালের পলাশি ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে ইংরেজদের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার পর বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় আর্থিক, ধর্মীয়, শিক্ষা ব্যবস্থা ও মানুষের শ্রেণিগত অবস্থানে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ইংরেজরা ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল মুসলমানদের নিকট থেকে। দরবারে এবং বাইরে প্রভাবশালী হিন্দুরাও পলাশির ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিল। এই দুই কারণে ইংরেজরা উপনিবেশি শাসন সুস্থির ও দীর্ঘায়িত করার কাজে সহযোগী হিসাবে বেছে নেয় উচ্চবর্ণের হিন্দুদেরকে। এ প্রক্রিয়ায় পরবর্তী চল্লিশ পঞ্চাশ বছরের মধ্যে উচ্চবর্ণের সংখ্যাল্প একদল হিন্দুর হাতে প্রচুর অর্থ ও ক্ষমতা দুটোই কুক্ষিগত হয়। এর মধ্যে কলিকাতায় সুচিত হয়েছে ইউরোপের আদলে নগরকেন্দ্রিক জীবন। অর্থ ও ক্ষমতা পাওয়া ঐ উচ্চবর্ণের হিন্দুরা কলিকাতসহ বড় বড় কেন্দ্রগুলোতে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি হিসাবে আবির্ভূত হয়। তাদেরও মাথার উপরে থাকে ইংরেজ প্রশাসকদল আর গুটিকয়েক হিন্দু ও মুসলমান চাকুরে বা ব্যবসায়ী। এই নয়া মধ্যবিত্তের হাতে ছিল ব্যবসা বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্যসহ সমাজের বেশিরভাগ তৎপরতার নিয়ন্ত্রণ। ইতিমধ্যে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের উদ্যোগে সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতদের হাতে তৈরি হয়েছে সংস্কৃতায়িত বাংলা গদ্য। এবং আর্য রাজরাজড়াদের কল্পিত গৌরব এবং দেবদেবীদের বিষয়ে পৌরাণিক কাহিনি নিয়ে বইপুস্তক রচনার ঝোঁক। এভাবে কলিকাতার উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অল্প কিছু লোক পরিণত হন শিক্ষা ও সংস্কৃতির উৎপাদক দলে। এর বিপরীতে ক্ষমতা কঠামোর বাইরে থাকা নি¤œশ্রেণীর বিপুল সংখ্যক বাঙালি মুসলমান ও হিন্দু পরিণত হয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির নিষ্ক্রিয় ভোক্তায়। এটি ছিল হেজেমনি বা ভাবাধিপত্য কায়েমের আদর্শ পরিস্থিতি, কলিকাতাকেন্দ্রিক বিত্তশালী উচ্চশ্রেণীর হিন্দুদের কর্তৃক সারা দেশের মুসলমানদের ও নি¤œ-শ্রেণির হিন্দু ও বৌদ্ধদের উপর চাপিয়ে দেয়ার জুতসই সময়।
উনিশ শতকের কলিকাতাকেন্দ্রিক আধিপত্যকামী ব্রাহ্মণরা সংস্কৃতায়িত যেÑভাষা চালু করেছিলেন তাকে মান ধরে অন্য রীতিগুলোর বিচার করতেন তারা। ইতিহাস থেকে আমরা জানি উনিশ শতকের কয়েক দশক পার হয়ে যাওয়ার পর বাঙালি মুসলমানসহ নি¤œশ্রেণীর হিন্দু ও বৌদ্ধরা উপায়ন্ত না দেখে এক পর্যায়ে নয়া ধাঁচের বিদ্যালয়ে আর্য-সংস্কৃতি ও ধর্ম নির্ভর পাঠ্যসুচী নিয়েই পড়াশোনা শুরু করে। এই শিক্ষার মধ্য দিয়ে শিক্ষিত হয়ে উঠার প্রক্রিয়ায় তারা আর্য সংস্কৃতি ও ধর্মদর্শনের ভাবাধিপত্যের(ঐবমবসড়হু) শিকার হয়। সেই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে শুরু করে দেশভাগ পর্যন্ত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আর্য বা ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি ও ধর্মকেন্দ্রিক বইপুস্তকের প্রাধান্য বজায় ছিল। এরপর এ ধারার প্রভাব কমে আসে, কিন্তু একেবারে দূর হয়নি। তাছাড়া পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন আসলেও প্রতিষ্ঠানের বাইরে ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়া আর্য-সংস্কৃতির প্রভাব জারি আছে আজ পর্যন্ত। এই সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও ভাবাধিপত্যের মধ্যে বেড়ে উঠেছিলেন ডক্টর আনিসুজ্জামান, আহমদ শরীফ, সৈয়দ আলী আহসান ও মুহম্মদ আবুদল হাইয়েরা। তাদের শিক্ষায় ও মননে বিচারের ভিত্তি ছিল সংস্কৃতায়িত বাংলা। সেই ভিত্তিতে দাড়িয়ে উনিশ শতকের বাঙালির অকৃত্রিম কথ্যবাংলার রচনাকে তাদেরও মনে হয়েছে দোভাষী সাহিত্য বা মুসলমানী সাহিত্য। একই কারণে ৩৫%-এরও বেশি সংস্কৃত শব্দবহুল মৃত্যুঞ্জয়ী বাংলাকে কিংবা তারও বেশি সংস্কৃতায়িত বঙ্কিম-মধুসূদনের ভাষাকে কখনোই ‘দোভাষী বাংলা’, ‘আর্যায়িত বাংলা’, ‘সংস্কৃত বাংলা’ ‘হিন্দু বাংলা’ মনে হয়নি। এখনো একই জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিবেশে শিক্ষা লাভ করে বহু শিক্ষক-লেখক-বুদ্ধিজীবী একই সাংস্কৃতিক ও ভাষিক আধিপত্যের মানসদাসে পরিণত হচ্ছেন, অন্য অনেক বিষয়ের মত প্রমিত বাংলাকেও আঁকড়ে ধরে এর যেকোনো ব্যত্যয়েরই বিরোধিতা করছেন। এটি একটি অবিরাম প্রক্রিয়া। ফলে উনিশ শতকের শুরুতে সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতদের সূচিত এবং পরবর্তীতে চল্লিশ পঞ্চাশ বছরে পরিপুষ্ট আর্যত্বকেন্দ্রিক জ্ঞানভাষ্যের আওতায় এখনো যারা প্রাতিষ্ঠানিক ও অ-প্রাতিষ্ঠিানিক শিক্ষার বলয় পার হয়ে আসেন তাদের অনেকের মধ্যে আর্যত্বের ধারণার প্রতি দাসসুলভ আনুগত্য থেকে যায়, যা দুর্মর ভাবাধিপত্যেরই অনিবার্য পরিণাম।
ভাবাধিপত্যের (ঐবমবসড়হু) দ্বিতীয় স্বভাব হলো যেকোনো বিকল্প মত বা তত্ত্ব উদ্ভবের প্রক্রিয়াকে গোড়ায় থামিয়ে দেয়া। ভাবাধিপত্যের শিকার লেখক-বুদ্ধিজীবীরা এর অন্ধ রক্ষক হিসাবে কাজ করে বলে তারাই বিকল্প মত বা তত্ত্বের উদ্ভবে প্রবল বাধা তৈরি করে। আমাদের মধ্যে এই দ্বিতীয় পরিস্থিতিটিও প্রবলভাবে সক্রিয়। আধিপত্যশীল মতের বিকল্প যে-কোন মত বা তত্ত্বকে গোড়াতেই নানা কায়দায় বাতিল করে দেয়ার প্রবণতা যেন আমাদের সহজাত। আর্যত্বকেন্দ্রিক ভাবাধিপত্যের শিকার কারো কারো বেলায় এর প্রভাব এতটাই প্রবল যে. একে রীতিমত অন্ধ ও উগ্র বলে অভিহিত করলেও বেশি বলা হবে না। নদীয়ার কথ্যবাংলার অনুকরণে প্রচলিত তথাকথিত প্রমিত বাংলার পরিবর্তে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের মান কথ্যবাংলায় লেখালেখির প্রস্তাবে এরা মারমুখী হয়ে উঠেন; প্রস্তাব ও সমর্থনকারীদেরকে ‘উগ্র জাতীয়তাবাদী’, ‘সাম্প্রদায়িক’, ‘পাকিস্তান আমলে বাংলাভাষার আরবীকরণের উদ্যোগীদের প্রেতাত্মা’ ইত্যাদি অপ্রাসঙ্গিক ও অযৌক্তিক মার্কা লাগিয়ে মুখ বন্ধ করে দেয়ার নোংরা প্রচেষ্টা চালাতেও পিছপা হন না। কিন্তু কখনো জ্ঞানতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিবর্তনের পটভূমিতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন না, অন্যদেরকেও করতে দেন না। এদের আচরণ চরমভাবে মৌলবাদী, ধর্মীয় গোঁড়াদের মতই, যার মূলে আছে আর্যত্ববাদী জ্ঞানভাষ্যের নিয়ত সক্রিয় আধিপত্য (ঐবমবসড়হু) থেকে জন্ম নেয়া দাস্যভাব। এবং ভাবাধিপত্যের নিয়মেই এদের আত্মসচেতনতা ও আত্মজাগরণের সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ । তাই মায়ের মুখের ভাষাকে সংস্কৃতের উপনিবেশে পরিণত করার ইতিহাসের বেদনা তাদেরকে কখনো স্পর্শ করেনি, এখনো করে না।
জেমস লঙ যে সাহিত্যকে ‘মুসলমানী বাংলা সাহিত্য’ মার্কায় আলাদা রাখার পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন তা ভালোভাবেই কাজে লাগায় সে কালে লেখালেখি ও জ্ঞানচর্চায় জড়িত উচ্চবর্ণের হিন্দুরা। বিপুল সংস্কৃত শব্দবহুল মৃত্যুঞ্জয়ী সংস্কৃত বাংলাকে তারা মান ভাষা হিসাবে দাঁড় করিয়ে ফেলে। একইভাবে, কথ্যবাংলায় লেখা বইপত্র মুসলমানী সাহিত্য হিসাবে আলাদা ও নি¤œমূল্যে চিহ্নিত করে কোণঠাসা করাও সম্ভব হয়। বিদ্যালয় বা পাঠাগার কোথাও এ জাতীয় বইয়ের ঠাঁই হয় না। এগুলো প্রচলিত থাকে বাঙালি মুসলমানের ব্যক্তিগত উদ্যোগে। এভাবে বাঙালির মুখের ভাষা লেখন রীতি থেকে চিরতরে নির্বাসিত হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের বাইরে সাধারণের পড়ার জন্য মান রচনা হিসাবে বিবেচিত হয় কেবল, বঙ্কিমের ভাষায়, ‘সংস্কৃতানুযায়ী বাংলায়’ লেখা বইপত্র।
এ যাবত বর্ণিত পরিস্থিতিটাকে সংক্ষেপে এবং আরও পরিচ্ছন্নরূপে উপস্থাপন করা যায় এভাবে: বৃটিশ দখলদারিত্বে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিস্থিতিতে রদবদল অনিবার্য হয়ে উঠে। এই পটভূমিতে বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা হয়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সাথে যুক্ত ইংরেজদের অজ্ঞতার কারণে বাংলা সাহিত্যির প্রচলিত ধারাকে পুরা বাদ দেয়া হয় এবং সে ধারায় যুক্ত হিন্দু-মুসিলম-বৌদ্ধ নির্বিশেষে প্রথাগত লেখকরা দৃশপট থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। নতুন বইপত্র রচনার প্রয়োজনে নয়া বাংলা গদ্য লেখার দায়িত্ব দেয়া হয় সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতদের। তারা তাদের জানাবুঝার ও সক্ষমতার মধ্যে যে বাংলা গদ্য তৈরি করেন তা মূলত মাত্রারিক্তভাবে সংস্কৃতায়িত বাংল। বাংলা না-জানা কিন্তু আরবিতে দক্ষ মোল্লাদেরকে নতুন ধরনের বাংলা গদ্য তৈরির দায়িত্ব দিলে মোল্লারা যেমন আরবি মার্কা বাংলা লেখবে এবং কোরআন-হাদিস-তাফসির ইসলামী জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ইসলামী উপাখ্যানের এক জগত নির্মাণ করবে, এ ক্ষেত্রেও তাই ঘটে–ভালো বাংলা না-জানা সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিত ‘মোল্লারা’ বাংলা বইপত্র রচনার দায়িত্ব পেয়ে সংস্কৃতে ঠাসা একটা বাংলা গদ্য তৈয়ার করে এবং নির্মাণ করে আর্য ধর্মাশ্রিত বইপুস্তক ও জ্ঞানচর্চার জগত। তাদের হাতে বিদ্যালয়, মুদ্রণযন্ত্র, স্কুল বুক সোসাইটি, স্কুল সোসাইটি ইত্যাদি থাকার কারণে এই সংস্কৃতায়িত বাংলা ভাষায় লেখা বইপত্রই পড়া হতে থাকে বিদ্যালয়গুলোতে ও সাধারণ পাঠক সমাজে। এর বিপরীতে প্রচলিত ধারার সাহিত্য চর্চা চলছিল মান কথ্যবাংলায়, যাতে সংস্কৃতের সাথে সাথে আরবি ফারসি শব্দও প্রয়োজন মাফিক যুক্ত হয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভারসাম্য নিয়ে এসেছিল। কিন্তু ব্রাহ্মণরা প্রধানত ধর্মীয় আবেগে উদ্বুদ্ধ হয়ে আরবি ফারসি শব্দকে মুসলমানী প্রভাব হিসাবে চিহ্নিত করে এবং সে ভাষায় রচিত সাহিত্যকে মুসলমানী সাহিত্য, বটতলার পুঁথি ইত্যাদি নানা নাম দিয়ে মূল¯্রােতের পড়াশোনার বাইরে ঠেলে দেয়। এ কারণে বাঙালির মান কথ্যবাংলার সাহিত্য কোণঠাসা হয়েই থাকে। অবিশ^াস্য হলেই সত্যি যে উনিশ শতকের ঐ পরিস্থিতিতে ‘মোল্লা-মার্কা’ একদল সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিত লেখোয়ার ধর্মাশ্রিত বইপত্র লেখালেখি প্রচলিত থাকে, অথচ মুদ্রিত বইয়ের জগত ও বিদ্যালয়াদি থেকে নির্বাসিত হয়ে যায় প্রথানুগ সেক্যুলার সাহিত্যের চর্চা। সেগুলো কোনোক্রমে টিকে থাকে তথাকথিত বটতলার পুঁথি আর মৌখিক রীতিতে। বহুযুগ পরে ‘লোক’ সাহিত্য অভিধায় নিচু ও অপ্রয়োজনীয় হিসাবে চিহ্নিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জায়গা পায় মুদ্রিত কাগজে। এ অবস্থার ফলে মুসলমানদের নতুন ধাঁচের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোন করতে হলে প্রচলিত পাঠ্যসূচী মেনে ইংরেজি বইপত্র আর মোল্লামার্কা সংস্কৃত পন্ডিতদের ধর্মাশ্রিত রচনাই পড়তে হতো। তাই বহুদিন এ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে দূরে সরে ছিল তারা।
এ পরিস্থিতি মুসলমানদের জন্য এতটাই বিপর্যয়কর ছিল যে, এমনকি জেমস লঙও লিখতে বাধ্য হন, “মুসলমানদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যাক লোকই ইংরেজি স্কুলে পড়াশোন করতে ইচ্ছুক। তারা স্যাক্সন জাতীয় লোকদের অনুকরণ করাও পছন্দ করে না। তাহলেও তাদের বেশ বুদ্ধি আছে এবং তারা প্রাচ্যদেশীয় বিষয়সমূহ অধ্যয়ন করতে ভালোবাসে। তাদের যে মানসিক মৃত্যু হয়েছে তা নয়, তারা স্বপ্নগ্রস্ত মাত্র। তাদের জন্য রুচিসম্মত পুস্তক প্রণয়ন করার উদ্দেশ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।” মুসলমানরা নতুন বিদ্যায়লগুলোয় পড়াশোনা করতে পারেনি। অন্যদিকে নি¤œশ্রেণীর হিন্দুরা অধিকাংশই ছিল প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখার বাইরে। তাছাড়া হিন্দু হওয়ার কারণে ধর্মীয় আবেগবশত তাদেরও আর্য-সংস্কৃতি প্রধান পাঠ্যসূচীতে অভ্যস্ত হতে সময় লাগে নি হয়ত।
তবে আর্থিক ও সামাজিক কারণে এ জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেশিদিন দূরে সরে থাকতে পারেনি বাঙালি মুসলমানও। সামাজিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হতে এক পর্যায়ে উপনিবেশি প্রশাসক-আর ব্রাহ্মণ্য শক্তির মিলিতে জোটের কাছে আত্মসমর্পণ করে তারা। প্রচলিত পাঠ্যসূচী মেনে ইংরেজির অনুকরণে গণিত, ভূগোল, ইতিহাস, আর অন্যদিকে, আর্য পুরাণ, দেবদেবীর স্তুতিমূলক বইপত্র দিয়েই প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রতিষ্ঠানের বাইরের পড়াশোনা শুরু করে বাঙালি মুসলান, নি¤œশ্রেণির বাঙালি হিন্দু ও বৌদ্ধরা। এর ফলে সংস্কৃতায়িত বাংলা ভাষা ও ইংরেজিতে পড়াশোনা করে আর্থিক দারিদ্র কিছুটা মিটাতে সক্ষম হলেও তারা হারায় তাদের ভাষার জগত, মান কথ্যবাংলা এবং উপনিবেশের আগের বাংলা ভাষার ঐতিহ্য ও সঞ্চয়।
১৮৩১ সালে শেখ আলীমুল্লাহ প্রকাশ করেন বাঙালি মুসলমানের প্রথম বাংলা সংবাদপত্র ‘জগদুদ্দীপক সাভারাজেন্দ্র’, ১৮৪৬ সালে রজব আলী বের করেন ‘জগদুদ্দীপক ভাস্কর’। নাম থেকেই বোঝা যায় এরইমধ্যে আলীমুল্লাহ, রজব আলীরা মৃত্যুঞ্জয়ী বাংলা শিখে ফেলেছেন এবং সে ভাষার মার্গীয় অবস্থানও স্বীকার করে নিয়েছেন। ১৮৪৯ সাল থেকে উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চপদে চাকুরীজীবি মুসলমানরাও মুসলমান ছাত্রদেরকে নয়া ধাঁচের শিক্ষায় উৎসাহিত করতে শুরু করেন। এদের মধ্যে আবদুল লতিফ ও সৈয়দ আমির আলী ছিলেন সবচেয়ে সক্রিয়। আব্দুল লতিফই সর্বপ্রথম স্কুল কলেজের পাঠ্য পুস্তক হতে ইসলাম বিরোধী বিষয় দূর করার দাবি তোলেন সরকারের কাছে; তিনি অবশ্য বাংলা শিক্ষার বিপক্ষে ছিলেন। আরো পরে দীনেশচন্দ্র সেন বাঙালি মুসলামানকে এই বলে সতর্ক করেন যে, “হিন্দু ভাবাপন্ন সাহিত্য পড়িয়া মুসলমানরা হিন্দু ভাবাপন্ন হইয়া পড়িবে”। ততদিনে নেতিবাচক প্রভাব যতটা পড়া দরকার তা ঘটে গেছে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ হতে শুরু কুরে কমবেশি ১৮৭০ সাল পর্যন্ত আর্য পুরাণ ও ধর্মাশ্রিত বইপত্রের ছড়াছড়ি এবং বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে এ শিক্ষা পদ্ধতির ভিতর দিয়ে যে সব মুসলমান শিক্ষা লাভ করে তাদের মন থেকে খাঁটি বাঙালির ঐতিহ্য যেমন হারিয়ে যায় তেমনি স্থায়ী প্রভাব ফেলে উত্তরভারতীয় আর্য সংস্কৃতি ও ধর্মমত।
উনিশ শতকের শুরুর অর্ধেক পর্যন্ত যেসব বাংলা বইপত্র রচিত হয়েছে সেুগলোকে খুব একটা উত্তীর্ণ বা মহত সাহিত্যের মর্যাদা দেয়া হয় না। তবে এর পর বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, মধুসূদনের রচনাবলীকে বাংলা সাহিত্যের জগতে অত্যন্ত উচ্চ আসনে জায়গা দিয়ে রাখা হয়েছে। এদের উঁচু মানের সৃজনশীল মেধার ব্যাপারেও কারো সন্দেহ থাকার কথা নয়, বিশেষত ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বেলায়। বাঙালির ইতিহাসে এরা দুজনই অত্যন্ত মেধাবী সৃজনশীল মানুষ হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছেন বহুকাল। ঈশ^রচন্দ্রের স্বজাত্যবোধ ও ইউরোপীয় আদর্শের মানব প্রেম এবং বঙ্কিমের ধর্মীয় জাতিত্বকেন্দ্রিক দেশপ্রেম অতুলনীয়। এ সময় রেনেসাঁর নামে হিন্দু পুর্নজাগরণের জোয়ার চলছিল। ইউরোপীয় রেনেসাঁর মর্মমূলে ছিল ইউরোপীয় আদর্শের মানুষ–মানবাত্মা। কলিকাতার নয়া মধ্যবিত্ত শিক্ষিত ব্রাহ্মণগোষ্ঠী এই রেনেসাঁর প্রাণশক্তিকে মননে ধারণ করে তার মর্মে প্রতিষ্ঠা করেন আর্যত্ববাদ। আর্য ধর্ম ও সংস্কৃতির কল্পিত অতীত গৌরব বর্তমানে প্রতিষ্ঠা করার ব্রত নিয়ে তারা বিভিন্ন লোকআখ্যানের আর্য চরিত্র, দেবদেবীর বিবরণ এবং কল্পিত ঐতিহাসিক আর্য চরিত্র সাহিত্যে চিত্রিত করতে থাকেন।
বিদ্যাসাগর আত্মনিয়োগ করেন হিন্দু সমাজ পুনর্গঠনে। ফলে তার লেখাতেও আর্য রীতিনীতি, পুরাণাদির উল্লেখ এসেছে ঘুরে ঘুরে। বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনের আধখানা ছিল কল্পিত আর্য জগতে, মনেপ্রাণে ইংরেজ হয়ে উঠার বাসনায় উদ্বেল মধুসূদনও যেন খানিকটা ঘোরের বশে উত্তরভারতীয় আর্য সংস্কৃতিরই প্রতিনিধিত্ব করেন। তাছাড়া, মৃত্যুঞ্জয়ী সংস্কৃতায়িত বাংলার বিকাশ সূচিতই হয়েছিল আর্যদের বিভিন্ন আখ্যান, পুরাণ কাহিনি, ধর্ম গ্রন্থ ইত্যাদি রচনার মধ্য দিয়ে। তার শব্দ ভান্ডার, পরিভাষা, বাগধারা, বাগবিধি গড়ে উঠেছে আর্য পুরাণের আশ্রয়ে। ধান ভানতে শিবের গীত, হাতের লক্ষœী পায়ে ঠেলা, ঘর শত্রু বিভীষণ, অকাল কুষ্মান্ড, সাতখন্ড রামায়ন পড়ে সীতা কার বাপ, ইত্যাদি অজস্ত্র প্রবাদ প্রবচনে অনেকটা সমৃদ্ধি এ ভাষার। এগুলোর ছিটেফোঁটাও আদিযুগের বাংলা ভাষায় ছিল না; কেবল সীমিত হারের সংস্কৃত শব্দ অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর আঠারো শতকের কথ্য বাংলার নমুনা তো তুলেই ধরেছি। সংস্কৃতের এসব উপাদানের প্রায় সবই বাংলা ভাষায় নতুন সংযোজন, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও মৃত্যুঞ্জয়ের প্রচেষ্টায় এবং তার অনুসারীদের ঐকান্তিক নিষ্ঠায় সংস্কৃত থেকে ধার করে এনে বাংলায় অনুপ্রেবেশ করিয়ে দেয়া। এসব পরিভাষা, বাগবিধি, বাগধারা, প্রবাদ প্রবচণের অর্থ ভালোভাবে বুঝতে হলেও প্রায় গোটা আর্য পুরাণ মুখস্ত করার প্রয়োজন পড়ে। এ প্রক্রিয়ায় হিন্দু ধর্মেরও অনেকটাই জানা হয়ে যায়। ফলে সংস্কৃতায়িত বাংলার মধ্য দিয়ে আমাদের মগজে জায়গা করে নেয় আর্য ধর্ম ও সংস্কৃতি। এভাবে বাঙালি সংস্কৃতি রূপান্তরিত হয়, আর্য সংস্কৃতির অনেক উপাদান জায়গা করে নেয় আমাদের মননে ও চর্চায়। সংস্কৃতের চাপে বাংলাভাষার ব্যাপক রূপান্তরের কারণে বাঙালির জ্ঞান ও সংস্কৃতির জগতে যে-সব গুরুতর পরিবর্তন হয় সেগুলোকে চিহ্নিত করা যায় এভাবে:
(১) কথ্যবাংলা কোণঠাসা হওয়ার অর্থ মুদ্রিত ভাষার জগত থেকে নির্বাসিত হওয়ার মধ্যদিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির অনেক সঞ্চয় যেমন কিস্সা, পালাগান, জারিগান, সারিগান, প্রবাদ প্রবচন কোনোক্রমে মৌখিক রীতিতে টিকে থাকে। তার বদলে জায়গা করে নেয় আর্য দেবদেবী ও রাজরাজড়াদের কল্পকাহিনি। বিদ্যালয়ে ও বিদ্যালয়ের বাইরে পাঠ্য বইয়ে তা পাঠ করতে বাধ্য হয় হিন্দু মুসলিম সকলই। এই পাঠ্যসুচিতে যে-সংস্কৃতি উপস্থাপিত হয় তা ছিল উত্তর-ভারতীয় আর্য সংস্কৃতি। কিন্তু বারবার পাঠের মধ্য দিয়ে তা গ্রহণ করে নেয় বাঙালি মন। বাঙালি নিজের বলে ভাবতে শিখে উত্তরভারতীয় সংস্কৃতিকে। তাই আমাদের সাহিত্যে বিশেষত কবিতায় এখনও উত্তর ভারতীয় তথা আর্য পুরাণের ছড়াছড়ি। বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতি চিহ্নগুচ্ছের অনেকগুলো হারিয়ে যায় লেখার জগত থেকে।
(২) বাংলা ভাষা সংস্কৃত থেকে উদ্ভুত এই আধাভুল আধাবানোয়াট ধারণা সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার পর বাঙালি মেনে নেয় যে সংস্কৃত ভাষাই তার নমস্য। তাই সংস্কৃত গ্রন্থাদি তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্ব পেতে থাকে, সেই সঙ্গে সেইসব গ্রন্থবর্ণিত কাহিনি, চরিত্র, ঘটনা, আচার, প্রথা।
(৩) নতুন গদ্যরীতি মধ্য দিয়ে আসে সংস্কৃত শব্দ ভান্ডার, পরিভাষা, বাগবিধি, বাগধারা, প্রবাদ প্রবচণ । এগুলো ফোর্ট উইলিয়াম বা মৃত্যুঞ্জয়ী বাংলার সৃষ্টি। আদিযুগের বাংলা ভাষায় এগুলো ছিল না। এসব পরিভাষা, বাগবিধি, বাগধারা, প্রবাদ প্রবচণের অর্থ ভালোভাবে বুঝতে হলেও প্রায় গোটা আর্য পুরাণ মুখস্ত করার প্রয়োজন পড়ে। এ প্রক্রিয়ায় আর্যদের ধর্ম ও সংস্কৃতির অনেকটাই জানা হয়ে যায়। ফলে সংস্কৃতায়িত বাংলার মধ্য দিয়ে বাঙালির মগজে জায়গা করে নেয় আর্য ধর্ম ও সংস্কৃতি। সেইগুলো শিখতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কাহিনি জানার প্রয়োজন পড়ে। তাই শিখে নিতে হয় আর্য পুরাণের অনেক কিছুই।
(৪) উনিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত, এমনকি তার পরও কিছুকাল সাহিত্য বলতে ছিল হিন্দু পুরান অবলম্বনে লেখা আখ্যানাদি। যেমন মেঘনাদবধ, শকুন্তলা, সীতাহরণ ইত্যাদি নিয়ে রচিত বিশাল বিশাল বই নাটক ইত্যাদি। এগুলো পড়ে হৃদয়ঙ্গম করতে হলে পুরা হিন্দুধর্মকে জানা প্রয়োজন হয়। বাঙালি সেটা করে ফেললে, পাঠের ও শিক্ষার প্রয়োজনে। এখন বাংলাদেশে শিক্ষিত মুসলমান বা খ্রিষ্টান বা বৌদ্ধ মাত্রই হিন্দু ধর্মের অনেক বিষয় জানেন, বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি বা ধর্ম সম্পর্কে ঐ পরিমান জানেন না।
(৫) প্রায় শ খানেক বছর ধরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপদ্ধতি, সাহিত্য, পত্রপত্রিকা ইত্যাদির মাধ্যমে ভাবাধিপত্য ((ঐবমবসড়হু) আরোপের গোটা প্রক্রিয়াটি সম্পুর্ণ হওয়ার পর দেখা গেল বাংলাদেশের শিক্ষিত মানুষ যা জানে তা আর্যদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, পুরান, ধর্ম ইত্যাদি।
(৬) জ্ঞান ও সংস্কৃতির এই আধিপত্য বিস্তারের প্রধান প্রধান মাধ্যমগুলো ছিলো শিক্ষা ব্যবস্থা, বই, পত্রপত্রিকা। পরে এর সাথে যুক্ত হয় সিনেমা গান ইত্যাদি। নাগরিক সুবিধার বাইরে থাকা সাধারণ বাঙালি সমাজের শিক্ষা বঞ্চিত অংশ এই সেদিন পর্যন্তও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, বই, পত্রপত্রিকা, সিনেমা ইত্যাদির থেকে দূরেই ছিলো। এ কারণে আর্যত্বের ভাবাধিপত্যের বাইরে থেকে গেছে তারা। তাদের মুখের ভাষাও সংস্কৃতের উপনিবেশে পরিণত হয়নি বলে বাঙালির প্রকৃত সাংস্কৃতিক চিহ্নগুলি অনেকটাই অটুট রয়ে গেছে সাধারণের মান কথ্যবাংলায়।
উপনিবেশিত ভাষা, বিকৃত ইতিহাস আর নিজের সংস্কৃতির অধিকাংশ চিহ্ন হারিয়ে অন্যের সাংস্কৃতিক চর্চাকে সম্বল করে একটা জাতি কোথায় পৌঁছাতে পারে? মরা ও সাম্প্রদায়িক এক ধারণা ‘আর্যত্ব’-এর প্রতি এই দাস্যভাব মনে জিঁইয়ে রেখে যে স্বদেশ প্রেমের চর্চা করেন তারা তার মধ্যে স্বদেশ কতটুকু থাকে? এই প্রশ্ন আরও আগেই জাগা উচিত ছিল আমাদের মনে। তাই বলে কখনো জাগবে এমন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের মানুষের বুঝ-এর মধ্যে এই অসঙ্গতি বার বার হানা দিচ্ছে, প্রশ্নমুখর করে তুলছে অনেকের মন ও মননকে। বাংলা ভাষা, বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে নানা জিজ্ঞাসা তলে তলে আলোড়িত করে চলেছে অনেক সচেতন মানুষকে। গত কয়েক দশক ধরে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন করে উঠে আসছে এইসব জিজ্ঞাসা।
এ যাবত আলোচনায় আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি যে, ইতিহাস ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে চিহ্নিত বিকৃতি বা কুনির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে বাংলা ভাষার রূপান্তরের মধ্য দিয়ে। এর সাথে যুক্ত ছিল অন্যান্য নিয়ামক উপাদান: বৃটিশ শাসন ও বৃটিশদের সাথে কলিকাতার উচ্চবর্ণের হিন্দুদের আঁতাত; বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠীর বাংলাভাষী নেতৃত্বের অভাব; মুদ্রণযন্ত্রের আগমণ এবং সেইসূত্রে প্রথম দিকে মুদ্রণ শিল্প, পত্রপত্রিকা ইত্যাদির উপর উচ্চবর্ণের হিন্দুদের একচেটিয়া আধিপত্য ইত্যাদি। এসবই অতীত মাত্র। বাংলাদেশ এখন একটা স্বাধীন দেশ। বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির মুক্ত চর্চা, ইতিহাস রচনার স্বাধীনতা তার আয়ত্তে। তবে দুইশ বছরের মানসিক আধিপত্য ছাপ রেখে গেছে তার মনোজগতে। সেই ছাপচিন্-এর ধরণ এখন জানা। মনোজাগতিক প্রভাব থেকে বেরিয়ে বাঙালির ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কিত জিজ্ঞাসাগুলি যাচাই করে নেয়া এখন জরুরী হয়ে দাড়িয়েছে। আর যেহেতু ব্যত্যয়ের সূচনা হয়েছিল ভাষার বিকৃতির সূত্রে, তাই ভাষার ব্যত্যয়গুলো চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে সূচিত হতে পারে আধিপত্যমুক্ত, ধর্ম ও শ্রেণিপ্রভাববিহীন স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক চর্চার। এ ক্ষেত্রে মুখের ভাষা বিশেষ করে মান কথ্যবাংলা বাঙালি সংস্কৃতির চর্চায় শুরুতে দাঁড়াবার মূল জায়গা হয়ে উঠতে পারে। উনিশ শতকের সূচনায় উপনিবেশী প্রশাসকদের ছত্রছায়ায় বাংলার সংস্কৃতায়নের প্রক্রিয়ায় বাংলা ভাষা থেকে যা হারিয়ে গিয়েছিল তার বেশ কিছু সঞ্চিত রয়ে গেছে আমাদের মুখের ভাষায়। তাই প্রথমেই দরকার তথাকথিত প্রমিত বাংলা অর্থাৎ নদীয়ার কথ্যবাংলার লিখিতরূপ চলিত ভাষার পরিবর্তে বাংলাদেশের মান কথ্যবাংলাকে আবেগ, ভাব ও চিন্তার কথ্য ও লেখ্য উভয়রূপের বাহন করা। এটুকু করতে পারলে আমাদের মায়ের ভাষা অর্থাৎ বাংলাদেশের মান কথ্যবাংলাই সঠিক পথের নিশানা দেখাবে।
ফয়েজ আলম; কবি, প্রাবন্ধিক, উত্তর-উপনিবেশি তাত্ত্বিক। জন্ম ১৯৬৮, নেত্রকোনার আটপাড়ায় যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা: মরহুম আবদুস সামাদ শেখ, মা: সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ^বিদ্যিালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে বিএ (সম্মান) ও এম. এ. পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল ডিগ্রী লাভ করেন। প্রকাশিত বই: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপখাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯), প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি (গবেষণা, ২০০৪), এডওয়ার্ড সাঈদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫), উত্তর-উপনিবেশী মন (প্রবন্ধ, ২০০৬) কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮), বুদ্ধিজীবী তার দায় ও বাঙালি বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১)।






Users Today : 3
Users Yesterday : 3
Users Last 7 days : 12
Users Last 30 days : 54
Users This Month : 11
Users This Year : 65
Total Users : 2071
Views Today : 4
Views Yesterday : 4
Views Last 7 days : 17
Views Last 30 days : 65
Views This Month : 16
Views This Year : 78
Total views : 2928
Who's Online : 0
সংস্কৃত অনুযায়ী বাংলা ভাষা নয়। আর একথা যুক্তি তর্ক প্রমাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ফয়েজ আলম ভাষাকে প্রাধান্য দিয়েছেন, যা আমাদের মানকথ্য বাংলা, মুখের ভাষাকে। ধন্যবাদ গবেষককে।