বাংলা গানের ‘লোক’, ‘গীতি’,‘সঙ্গীত’ তকমা ও শ্রেণিকরণের রাজনীতি: একটি উত্তরউপনিবেশি পর্যালোচনা

বিজিৎ দেব

মানুষ কেবল মাটির আশ্রয়ে বাঁচে না, ভাষার মধ্যেও বাঁচে, ভাষার মধ্যে সে মানুষ হয়ে উঠে। সংস্কৃতি বলতে যা বুঝায় তার মূর্তিটার অনেকখানিই ভাষা দিয়ে বানানো।১ বস্তুত মানুষের সামাজিক জীবনের অধিকাংশ জায়গা জুড়ে ভাষারই রাজত্ব, আমরা ভাষার ভিতর বাঁচি, ভাষার আয়নায় আমাদের আত্মপরিচয়ের সংস্কৃতিক লড়াই জাগ্রত থাকে । এই রাজত্বে প্রতিদ্বন্দ্বী ‘লোকগান’ বনাম ‘সঙ্গীত’ ভাষার লড়াইয়ে লিপ্ত হয়।
সাধারণত ভাষাকে বাহন করেই সুরের স্ফূর্তি হলেই গান হয়ে উঠে। কিন্তু ভাষা ছাড়াও ধ্রুপদ খেয়াল, রাগ এগুলো মানুষের মনের গভীরে আলোড়ন তুলতে পারে। এমনকি গুনগুন করে একটা সুর তুললেও মনে তার আলোড়ন উঠে। কাজেই সুর এখানে মূল জিনিষ।
গানের জন্ম মানুষের অন্তর্গত ভাব থেকে। অন্তরাত্মার গহীন থেকে আবেগের উদ্বেল প্রকাশ হয় সুরের আশ্রয়ে। এই প্রকাশ সহজাত এবং কোমল। এখানে বুদ্ধির তেমন খেলা নেই। লালন যখন বলেন ‘খাচার মাঝে অচিন পাখি, কেমনে আসে যায়’ তখন মন, দেহ এবং মাটির যুগসূত্র তিনকে এক করে দেয় সুরের আবেশ। এ সত্ত্বেও আমরা আমাদের শিকড়েরর কথা ভুলে যাই। আত্মসত্তা বিক্রির মহড়া যে বা যারা শুরু করেছিল, যুগ-পরম্পরায় সেটা বয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে আমাদের বাংলা গানের ধরনধারণ দেখে মনে হয় এও কেবলই পণ্য। পতনের শুরুটা করে কোনো একটা গোষ্ঠী, অতপর তার অনুকরণ চলতে থাকে অবাধে। এই করুণ আর্জি কোনও কেতাবে আসে না। কারণ হিসেবে বাণিজ্যিক মন এবং মনের দ্বৈরথ থেকে এই প্রবণতার সৃষ্টি হয়েছে। এই ভুলে যাওয়ার কারণ নব্যভাবের সঙ্গে আদান প্রদানে নিজেকে বিদেশী করে তোলার প্রবণতা। চর্যাপদের গান আমাদের এক সভ্যতার ইতিহাসের শোষণ এবং বঞ্চনাকেও তো তুলে ধরেছে। জাতপাতের বেড়াজাল এবং উপনিবেশ থেকে মুক্তির সোপান সেটা। কিন্তু আধুনিক নামের ¯্রােতে সেই বিপুল ঐতিহ্যিক সঞ্চয়কেও তলে ফেলে দেয়া হচ্ছে। সবকিছুকে একটা বাজারজাত পণ্যের ভিত্তিতে হিসাব করার দীনতা হেতু আজ বাংলা গানের আদত দেশাত্মা কদর হারাচ্ছে ।
বাংলাদেশের গানের সঙ্গে ঐতিহ্যের ঠেক দিয়ে বিন্যাস করা হচ্ছে বিভিন্নভাবে। আমরা ঐতিহ্যের পরিপন্থী নই, বরং ঐতিহ্য যে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়ে প্রায় দুই শত বছরের নিগড়কে মোকাবেলা করে আসছে তাই এই লেখার অভিপ্রায়। গান তো মানুষের জন্য। এখানে সাধারণ মানুষ, উচ্চশ্রেণীর মানুষ বা আরসব মানুষ সবার উপভোগ বা আত্মিক সংকট মোচনের ভাষিক-সুরের যোজিত অধিবিদ্যক উচ্চতর এক মেলবন্ধন হইল গান । সোজা কথায় গান দেহ মন এবং আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। গানের ক্ষেত্রে বিচিত্রভাব এবং বৈচিত্র্য থাকবে। বাংলাদেশ বা প্রাচ্যভূখন্ডের স্বকীয়তাকে বিচারের ক্ষেত্রে কেন অন্য দেশ বা জাতির বিচারিক মানদন্ড টেনে আনতে হবে? এই প্রশ্ন আজও উচ্চারতি হয়নি। কারণ হিসাবে কী বিবেচনায় আসবে বা আসবে না বোদ্ধা ব্যক্তিগণ সহজেই তার উত্তর দিতে পারেন। তবুও যুগ যুগ ধরে গড্ডলিকা প্রবাহে ভাসমান আমাদের বুদ্ধিজীবী এবং গবেষক মন। এক হচ্ছে সাহসের অভাব, আরেকটা হচ্ছে মনের দীনতা। উচ্চপদ বা ক্ষমতায় আসীন ব্যক্তিদের খুশি করার একটা প্রবণতা বিভিন্নভাবে সমাজে সাহিত্যে রাজনীতি একং দৈনন্দিন জীবনের প্রায়োগিক ক্ষেত্রে জোরালো স্বভাবে
বাংলাদেশের গান নিয়ে সামগ্রিকভাবে যে মনোভাব জারি আছে তার মধ্যে অনেক ফাঁকফোকর আমরা লক্ষ্য করি। এখন গান বলতে ‘আধুনিক গান’ পরিভাষায় যা বোঝানো হয় তার মধ্যেই মানুষের গুরুত্ব বেশি। কিন্তু এই মানুষেরা সংখ্যালঘ্,ু একটি গোষ্ঠীর মত ও পথের স্বার্থ-উদ্ধারে নিয়োজিত। সিনেমায় প্রচারিত গানকে তারা আধুনিক গান বলে থাকেন। গানকে বাজারদরে বাাহারী পোশাক পরিয়ে আধুনিক গানের সিল দিয়ে মিডিয়ার সাহায্যে প্রচার করা হচ্ছে। এসবই বাংলা গান নিয়ে আমাদের চিন্তার ও কাজের দীনতার প্রকাশ করে।

এর মধ্যে সবচেয়ে দুঃখজনক একটা প্রবণতা হলো বাংলা গানকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে শিল্পমর্যাদা দেয়ার চেষ্টা। এইসব শ্রেণি বা তকমাগুলোর প্রচলিত কয়টা পরিভাষা হচ্ছে ‘লোক’, ‘গীতি’ ও ‘সঙ্গীত’। ‘লোক’ কথাটা পশ্চিমের ‘ফোক’ পরিভাষা থেকে আমদানীকৃত। ‘গীতি’ আমাদের আর ‘সঙ্গীত’ উত্তর ভারতীয় সংস্কৃত ঐতিহ্যের ভিত্তিতে বানানো। পাদরী লাল বিহারী দে ’ ‘ফোক টেলস অব বেঙ্গল’ নামে কিস্সার একটি সংকলন প্রকাশ করেন ১৮৮৩ সালে। এরপর থেকে বাংলার মুখের সাহিত্য কিস্সা হয়ে যায় ‘লোক কাহিনী’ এবং এখান থেকেই ‘লোক’ পরিভাষাটির ব্যবহার বিশেষ গুরুত্ব পেতে থাকে। এই লাল বিহারী দে যে অর্থ ‘লোক’ কথাটা ব্যবহার করেন তা ব্যাখ্যা করা দরকার। তখন কলিকাতাসহ অনেকগুলো শহরের রমরমা অবস্থা ভারতে। সেইসব শহর ঘিরে বৈচিত্রময় নাগরিক জীবন। এর বিপরীতে গ্রামের মানুষের জীবন ছিলো আগের মতই প্রথানুগ। শহরের জীবনের প্রতি গ্রামের মানুষেরও বিপুল কৌতূহল; কারণ সেখানে প্রায় বাধাহীন ভোগের উৎসব, আর প্রাণী হিসাবে মানুষ তাৎক্ষনিকভাবে ভোগের কথাটাই আগে ভাবে। তো এ অবস্থায় ইংরেজ সাহেব আর তার বাঙালি দোসররা নগর জীবনের ভোগময় পরিবেশে বসবাস করে বাংলাদেশের প্রাচীন সাহিত্য, ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব বিষয়ে নিয়ত আগ্রহ জারি রাখতো, যদি কিছু একটা আবিষ্কার করে ছেপে দিয়ে কিছুটা নাম কুড়ানো যায়। এর মধ্যে গ্রামের মানুষের জীবনযাপনের বিবরণও পড়ে। তো এইরূপ পন্ডিত হয়ে উঠার বিপুল আগহের সময় ‘লোক’ কথাটার ব্যবহার জনপ্রিয় হয় ‘পুরান, গ্রামীণ’ ইত্যাদি অর্থে। একসময় এর সাথে যুক্ত হয় ‘নি¤œরুচি’, ‘অশিক্ষিত মানুষের সৃষ্টি’ ইত্যাদি ধারণা। সেই থেকে এখন পর্যন্ত লোক কথাটা ঐসব অর্থেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এখন ‘লোক’ বলতে বোঝায় গ্রামের মানুষের কোন শিল্প, যা গ্রামীণ তাই অশিক্ষার ছোঁয়ায় দুষ্ট, সাধারণ মানুষের মোটা রুচির পরিচায়ক, তাই নি¤œ-শিল্পমানে সাব্যস্ত হওয়ার যোগ্য।

আমাদের কথা হচ্ছে গানকে সংগীত, গীতি, লোক ইত্যাদি বিভাজনের মধ্যে ফেলে সামাজিক মর্যাদার সাথে জাড়নো কেন? গানের মর্যাদা বা গুরুত্ব ঠিক হবে তার আসল শিল্পমূল্যের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে। গানটা কোন জায়গার মানুষ লিখেছে, গ্রামের মানুষ না শহরের মানুষ লিখেছে এবং কোন সম্প্রদায়ের কথা উঠে এসেছে তার ভিত্তিতে গানের শ্রেণী এবং সেইসূত্রে মূল্য ঠিক করা অনুচিত। এইসব ব্যাখ্যা এবং দৃষ্টিভঙ্গীর কায়দায় উপনবেশী দাসত্বের পন্থাকেই অবলম্ববন করা হচ্ছে। আমি পূর্বেই বলেছি ভাষার কথা। ভাষা দিয়ে একটা গানের মর্যাদাকে ঠিক করা কতটুকু সঙ্গতিপূর্ণ। অনেকক্ষেত্রে তাই হচ্ছে। এ-প্রসঙ্গে বলতে হয় যে পশ্চিমের মানুষদের তৈরি চোখ দিয়ে দেখার অভ্যাসটা বন্ধ করা, আমাদের ঐতিহ্যের আলোকে নিজেদের দৃষ্টিকোণ সৃষ্টি করে নেওয়াই মূল জরুরি। কাজেই, একটা কথা নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায় যে, উত্তরাধুনিকতার নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা এখানে গ্রহণঅযোগ্য। তবে উত্তর-উপনিবেশি ভাবনা অতীতের অন্ধ অনুকরণে উৎসাহী নয়, বরং ঐতিহ্য থেকে পুষ্টি গ্রহণ ও দিক-নির্দেশনা নেয়ার পক্ষপাতী। ( দ্রষ্টব্য, ফয়েজ আলম, উত্তর-উপনিবেশি মন, পৃ. ৩৩) তাই উত্তর-উপনিবেশিক তাত্ত্বিক ফয়েজ আলমের কথার সূত্র ধরেই বলতে হয় আমাদের হাজার বছরের যে সংস্কৃতি আলো বাতাস দিয়ে যাচ্ছে তার কোলে জন্ম নেয়া গ্রামের মানুষের প্রাণের গানকে ছোটো বা হীন করে দেখার সুযোগ নাই। বরং এভাবে দেখলে তাকে উপনিবেশী দাসত্বের আর পশ্চিমের চিন্তার অনুসারী উত্তর-আধুনিক নৈরাজ্যের গোলামিই বলতে হবে। এ ছাড়াও বহুজাতিক কোম্পানির পণ্যবিস্তৃতির কায়দায় আমাদের সাত্তিক মানস-আশ্রয়ী মরমি ধারার এবং একদম মনের অকৃত্রিম গানগুলোকে একটা কাঠামো দিয়ে হেয় করা হচ্ছে। উপনিবেশি মননে মর্যাদাগত বিন্যাসে এসব শিল্পী এবং গীতিকারদের হেয় করে দেখা হয়। আমাদের এই প্রবন্ধ উদ্দেশ্য প্রণোদিত। কেন তা বলছি। এসব কাঠামো থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায়, কিভাবে আমাদের জনমানুষের গানকে যথাযথ সামাজিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা যায় সেটা আমাদের লক্ষ্য।
জনমানুষের কথা যদি বলি, বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের কথা যদি বলি তাহলে বলতে হয় আমাদের গানের প্রধান জায়গা জুড়ে আছে লালন, আবদুল করিম, হাসন রাজা, আব্বাস উদ্দিন, দ্বীন ভবানন্দ, উকিল মুন্সি, জালাল, রশিদ উদ্দিন, আরকুম শাহ, গিয়াস উদ্দিনসহ ওই ঘরানার পদকর্তাদের গান। এঁদের গান জনমুখি। এরা গান লিখেছেন এবং গেয়েছেন কোটি কোটি মানুষের জন্য। সাধারণ মানুষের অন্তরের কথা, আকাক্সক্ষা, দুঃখ-বেদনা সুখ-স্বপ্ন ভাষা পেয়েছে তাদের গানে। শ্রেণি-নির্বিচারে সকল মানুষের সমাবেশে এইসব গান শোনা এবং পরিবেশন করা হয়। রুিচর ক্ষেত্রেও ওইসব গান উচ্চমার্গের। কিন্তু এখানে একরকম পেলবতা আছে যা শ্রেণি-নির্বিশেষে মনের রুচি রক্ষা করে আসছে পরম্পরায়।
এখন আসা যাক গীতিকার এবং শিল্পির গুরুত্বে। ব্রাহ্মণ-শূদ্রের ভেদ এখানে সর্বোতভাবে রক্ষিত। তথাকথিত আধুনিক গান বা সিনেমার গানের শ্রোতা এদেশের মানুষের ক্ষুদ্র একটা অংশ। এরা সংখ্যালঘু, বিশাল জনগোষ্ঠীর সুবিধাবাদী অংশ। এরা শুনে ‘আধুনিক’ বা ‘সিনেমা’ নামের গান। সেসব গানের গীতিকার এবং শিল্পী উচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। অন্যদিকে, বিশাল জনগোষ্ঠীর মনের ভাব ও সুর নিয়ে যে গান যুগ যুগ ধরে বিকশিত হয়েছে সেইসব গানকে ‘লোক’ ট্যাগ লাগিয়ে বুঝানো হচ্ছে যে এই গান নি¤œ-রুচির।
ব্রিটিশ গেলো, পাকিস্তান গেলো, বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর চলে গেছে। মুখে মুখে বলা হচ্ছে স্বাধীন সংস্কৃতি। কিন্তু কাজে আর সৃজনে বয়ে চলছে উপনিবেশের ¯্রােত। এ হলো এক ধরনের হেজিমনি বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য। র্যামন্ড উইলিয়ায়ের মতে হেজেমনি বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য বলতে আমরা বুঝি কেবল এক সংস্কৃতি কর্তৃক অন্যসংস্কৃতি ওপর প্রাধান্য। প্রাথমিকভাবে তা সত্যি। কিন্তু এখানেই শেষ হয়ে যায় না। প্রভাব বিস্তারের গোটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংস্কৃতি সমাজের তলা পর্যন্ত স্পর্শ করে থাকে এবং চুঁইয়ে চুঁইয়ে ভিজিয়ে রাখে সমাজের প্রতিটি স্তর। ( দ্রষ্টব্য. ফয়েজ আলম : ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে, পৃ. ৫১) একজন রবীন্দ্র সঙ্গীতের শিল্পীর বা নজরুল সঙ্গীতের বা ওই ধাঁচের গানের শিল্পীর মর্যাদা অনেক উপরে। এই মর্যাদার ভিত্তি কি? ভিত্তি হলো স্বল্প কিছু লোকের তথাকথিত ‘আধুনিকতার রুচি’, শহুরে সমাজের সংখ্যাল্প কিছু মানুষের অযৌক্তিক রায়। কথা হলো যাদের গান কোটি কোটি মানুষের প্রতিদিনের মনের খোরাক সেগুলোকে কোন বিচারে পেছনের সারিতে রাখা হয়? উকিল মুন্সির একটা গান ‘আমার গায়ের যত দুঃখ সয়’ সেটা ৬০/৭০ বছর ধরে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের মনের খোরাক হয়ে আছে। শহরের বহু মানুষেরও মনের খোরাক। অথচ এই গানকে এবং এ জাতীয় সকল গানকে বলা হচ্ছে ‘লোকগীতি’। ‘ক্লাসিক’ বলে আরেকটা কথা অনেক কাল থেকে চালু আছে। এটাও একধরনের বিভাজননীতির ফল।
জনপ্রিয়তার নিরিখেও যদি বিচার করা হয় তাহলে করিমের গান, উকিল মুন্সি বা ওই ঘরানার গান যতজন লোক শুনে তার শতাংশ পরিমাণও লোক তথাকথিত ‘ধ্রুপদ বা আধুনিক’ গান শুনে না। অথচ মর্যাদার বিচার করতে বসলে লোকগীতিকে মনে করা হয় নি¤œ-মর্যাদার। নি¤œ- সামাজিক মর্যাদায় চিহ্নিত করার জন্যই এগুলোকে ‘লোক’ পরিভাষায় বেঁধে দেয়া হয়।
গান শোনার ব্যাপরেও আছে হরেকরকম বৈচিত্র্য। দৈনন্দিন জীবনের আত্মিক খোরাক হলো করিম, হাছন, উকিল মুন্সি, লালন, রাধা রমনসহ এই মূলধারার ঘরানার গান। একটা আধুনিক গান কত সময় বাতাসে বেড়ায়? খুব বেশি সময় নয়। একজন শ্রোতা শোনার পর এর স্থায়িত্ব এইটুকু পর্যন্ত। লালন বা উকিল বা করিমের গান আঙিনা থেকে বিশ্বচরাচরে ব্যাপ্ত থাকে। এই গানের ভাষা সহজ সরল, সাধারণের মনের রুচির ও ভাব প্রকাশের উপযোগী, এই গানেই জনমানসের আসল স্ফূর্তি।
এই যে গানের মূলধারা, সেই মূলধারার গীতিকার, সুরকার বা গায়কদেরকে হেয় করা হয় কোন স্বার্থে? যেমন করিমের গানকে সংজ্ঞায় ফেলে তারা একটি কূপে রেখে দেন। তাদের বানানো ‘লোক’ পরিভাষা মানে হেয়জাত ভদ্রসমাজের গালির নামান্তর। কিন্তু দেখা যায় লালন, জালাল বা করিমকে ছুঁয়ে, তার গানকে ব্যবহার করে অনেক গবেষক এবং শিল্পী পেয়েছেন খ্যাতি, সম্মান যশ এবং অর্থ। হাবিব তো করিমের গান গেয়ে বিপুল আর্থিক, সামাজিক প্রতিপত্তি এবং সম্মান অর্জন করেছেন। নিজস্ব বোধ এবং চিন্তার দীনতাই এদেরকে কুক্ষিগত করে রাখছে যুগযুগান্তর। আধুনিক গান, সিনেমার গান বা আইটেমকে ঘিরে গান নিমিষেই হারিয়ে যায়। শুধু আবদুল করিমের গানের কথা বললাম। করিমের মতো অনেক পদকর্তা আছেন, তাঁদের গান এবং সুর অহোরাত্র কানের ভেতর দিয়ে সাড়া জাগায়, আলপনা তুলে কর্মে ও সৃজনে।
মূলধারার গানের রচয়িতার মধ্যেÑ লালন সাঁই, রাধারমণ দত্ত, উকিল মুন্সি ও করিমের গান এসব মূলধারার গীতিকারের গান দীর্ঘকাল ধরে বেঁচে আছে মানুষের আত্মার আশ্রয় হয়ে। লালনের গানের সমাজবিপ্লব, শ্রেণিচেতনা ও অধ্যাত্মবোধ; করিমের গ্রাম-বাংলার সুখ-দুঃখের পদাবলি, সমাজ-সংস্কার ও অধ্যাত্মচেতনা, রাধারমণ দত্তের রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলি এবং উকিল মুন্সির বিচ্ছেদের গান ও মরমিকথা জনবাংলার প্রতিটি মানুষের প্রাণের সম্পদ। প্রত্যেকের গানে ও সুরে বাংলাদেশের মানুষদের মনের আকাঙক্ষা। এই মূলধারার গানে আছে সমাজ, পরিবেশ এবং প্রতিবেশের জঙ্গম প্রকাশ। আছে ভাষার অকৃত্রিম অবলম্বন। অনেকক্ষেত্রে গবেষকগণ এসব পদকর্তাদের ভাষার নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন উপনিবেশী জ্ঞানের ভিতিত্তে। এদের নিজেদের জ্ঞান এবং রুচি উপনিবেশের দাসত্বে আনত। অথচ এই দাস্য মনোভাব নিয়ে অন্যের গানের মূল্য নির্ধারণ করে ফেলছেন। এভাবেই ‘লোক’ পরিভাষাটির প্রসার হয়েছে।
আমরা আগেও উল্লেখ করেছি লোক শব্দের আমদানিকারক উপনিবেশি দালাল বাঙালি খ্রিষ্টান পাদ্রি লাল বিহারী দে। তাঁর ফোক টেলস অব বেঙ্গল একটি অসম্পূর্ণ গ্রন্থ। ইংরেজ উপনিবেশের ধারাবাহিকতায় রচিত গ্রন্থে সাজানো বিষয়। বিদেশি সংজ্ঞার আদলে কি আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি চলে? আমাদের প্রায় গবেষকদের মননভূমি এভাবেই চর্চিত হয়েছে।
আরেকটি বাণিজ্যিক কোম্পানি আকাশবাণী তাদের নিজেদের স্বার্থে আমাদের মূলধরারার গানকে ‘লোকসংগীত’ লেভেল মেরে নিজেদের উপনিবেশি মনকে আরও জাহির করে দিয়েছে। এই প্রবণতা মূলত উপনিবেশী প্রভাবের দাস প্রবণতা যার পরিনাম হলো–‘স্থানীয় সংস্কৃতির আংশিক বা সম্পূর্ণ বিলুপ্তি। স্থানীয় সংস্কৃতির টিকে থাকা বৈশিষ্ট্যগুলোর অবমূল্যায়ন; ওগুলোকে নিকৃষ্টরূপে দেখার প্রবণতা। আত্মপরিচয় সম্পর্কে উপনিবেশিতের হীনমন্যতাবোধ।’ ( দ্রষ্টব্য, ফয়েজ আলম, পূর্বোক্ত, পৃ.২০)
ঢালাওভাবে মূলধারার এসব মরমি কবি এবং গীতিকারদেরকে নিম্মমানের হিসাবে শ্রেণিকৃত করছেন ছদ্মবেশী আধা-মুর্খ সমালোচকগণ। বিদেশী ভাব ও আচরণে আড়ষ্ট তাদের চিন্তা এবং চেতনার দ্বারা। লোকসংগীতকে বলা হচ্ছে গ্রামের বা শহরের নিরক্ষর মানুষের অশালীন রুচির শিল্প। শুধু তাই নয়, সমাজে যাদের ‘লোক’ বলে অভিহিত করা হয় ধরে নেয়া হয় তারা সাধারণ, অমার্জিত এবং নিরক্ষর মানুষ। সভ্যতার বাইরের মানুষও বলেছেন অনেকে। তাঁদের ভাষাকেও বলছেন অমার্জিত। তাঁদের ভাষাবোধ এবং সমাজচেতনা ও প্রকৃতিভাবনা তো তাদের মননগত, সেইগুলাকে কোন জ্ঞানের নিরিখে বিচার করলে কি সেই বিচার যথাযথ হয়? এইসব গান বাণিজ্যিক করে তোলার মতলবে অনেক গবেষক/গায়ক এগুলোর ভাষা নিজের মত করে বদলে দিয়ে নতুন পরিবেশনের রাস্তা করে দিয়েছিলে, যা মূর্খতা ও অনধিকার চর্চা ছাড়া আর কিছু নয়। এমনকি চন্দ্রকুমার দে ও জসীমউদ্দীনের কিছু কিছু সংগ্রহের ভাষা পরিবর্তন করে ফেলেছিলেন। উপনিবেশিক তাত্ত্বিক ফয়েজ আলমের কথার সূত্র ধরেই বলি আমরা উপনিবেশের জগদ্দলকে এখনও বহন করছি সমাজে সভ্যতায় ও সংস্কৃতিতে। এজন্যই উপনিবেশিত মনের বিচারিক বুদ্ধিতে কোটি কোটি মানুষের অন্তরের সুরেলা প্রকাশকে ‘লোক’ অভিধা দিয়ে নীচ মর্যাদায় কোণঠাসা রাখার চেষ্টা।
বিদেশি শিক্ষাধারায় ভাবপুষ্ট বুদ্ধিজীবী গবেষক দল অনেকটাই স্ববিরোধী। বাংলাদেশের গানকে ‘লোক’, ‘গীতি’, ‘সঙ্গীত’ তকমার সাথে সামাজিক মর্যাদা ও রুচির মাত্রা লাগিয়ে তাতে বাংলাদেশের গানকে শ্রেণিকরণের এই প্রবণতা নিঃসন্দেহে উপনিবেশী দাস মনের পরিচায়ক। আমরা বরং মনে করি কোটি কোটি মানুষের প্রাণের গান লালন, রাধারমন, উকিল মুন্সী, করিমে, জালাল প্রমুখের গানই হলো বাঙালির মূলধারার সঙ্গীত। বাকীগুলো উপশ্রেণির সৃষ্টি, অল্পকিছু মানুষের রুচি ও মনোভাবের পরিচায়ক। এখানে একদিকে অবদমন করা হচ্ছে স্বকীয়তাকে, অপরপক্ষে একটি ভ্রান্ত শ্রেণিকরণের মধ্য দিয়ে গানের ক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থেই বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে একটি উপনিবেশি জ্ঞানভাষ্যকে (ডিসকোর্স)। এর মধ্য দিয়ে বাঙালির আত্ম-পরিচয়েও একরকম রদবদল হচ্ছে ধীরে ধীরে। সত্যিকার অর্থেই আমরা শিকড়-বিমুখ হয়ে নিজেদেরকে পশ্চিমের সাদা-চামড়ার উপযোগী করছি দিনের পর দিন।
এখনও সময় আছে এই অন্ধ অনুকরণ থেকে বেরিয়ে এসে প্রচার করা জরুরি যে এই ধারার গানই আমাদের মূলধারার গান, এগুলোই আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির পরিচয়, এসব পদকর্তা-সুরকার-গায়করাই আমাদের মৌলিক সংস্কৃতিকে তুলে ধরার এবং আমাদের আত্মার খোরাকের যোগানদাতা।

জহির হাসান

বিজিৎ দেব: প্রাবন্ধিক, গবেষক, ছোটো কাগজ সম্পাদক । জন্ম, ১৯৮৫, মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার দেবীপুর গ্রামে। বাবা : কবি ইন্দ্রজিৎ দেব,  মা : খেলা দেব। সিলেট এমসি কলেজ হতে বাংলা সাহিত্যে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল গবেষক হিসাবে কাজ করছেন। প্রকাশিত বই ১০টি;  এর মধ্যে, মহুয়ার বনে (কবিতা, ২০০৬), শেখ ওয়াহিদগীতি সমগ্র (সম্পা. ২০০৯), রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানদর্শন( প্রবন্ধ, ২০১০), সৈয়দ মুজতবা আলীর পঞ্চতন্ত্র (প্রবন্ধ, ২০১০) মুক্তিযুদ্ধের সহজপাঠ (গবেষণা,২০২০) অন্যতম উল্লেখযোগ্য।। ই- মেইল : debbijit08@gmail.com, debbijit21@gmail.com.

1 comment

  1. “লোক” গীতি আর সংগীত এই দুইয়ের মধ্যে যে বাকবিতণ্ডা এবং শ্রেণিকরণের যে তকমা আমরা দেখে আসছি এতো কাল ধরে, তার সুস্পষ্ট যুক্তি মিলেছে এই অসাধারণ লেখনীর মাধ্যমে। গবেষকের মতে এগুলোকে লোক গীতি সংগীত না বলে ” মরমীধারার মউলিক গান” বলাই উচিত। আমরা এর পক্ষে। অসংখ্য ধন্যবাদ গবেষককে♥

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।