নয়া-উপনিবেশবাদ: সাম্রাজ্যবাদের শেষ পর্যায়

কওমে ইঙ্ক্রুমা

তরজমা: রাজিয়া সুলতানা 

কওমে ইঙ্ক্রুমারNeo-colonialism: The Last stage of Imperialism গত শতকের গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রকাশনার অন্যতম। উপনিবেশী শাসনের অবসানের পর আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ প্রাক্তন উপনিবেশগুলোয় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য নয়া-উপনিবেশী কায়দায় প্রভাব বিস্তার করার কৌশল বের করে। এতে সরাসরি কোনো দেশ দখল না করেও তার অর্থনীতি কব্জা করার মাধ্যমে দেশটির সরকারকে সামগ্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই নয়া-উপনিবেশি কৌশলের গোড়াপত্তন, নমুনা ও অন্যান্য বিষয়ে ইঙ্ক্রুমা গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ হাজির করেন তার এই বইটিতে। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হওয়ার পরপর আমেরিকা সহ অনেক ইউরোপীয় দেশে এটি এতটাই আলোড়ন সৃষ্টি করে যে, বইটিতে বৈরি সমালোচনার সম্মুখিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইঙ্ক্রুমার কাছে লিখিত প্রতিবাদ জানায় এবং ঘানাকে দেয় ২৫ মিলিয়ন ডলারের মার্কিন সাহায্য তৎক্ষাণাৎ বাতিল করে দেয়। এটি নয়া-উপনিবেশবাদের আলোচনায় প্রথম পথনির্দেশী বই।
কওমে ইঙ্ক্রুমা ঘানার রাজনীতিবিদ, বিপ্লবী, তাত্ত্বিক। ১৯০৯ সালে জন্ম তাঁর। দেশে এবং বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন। বিদেশে থাকাকালেই প্রবাসী আফ্রিকানদের সাথে প্যান-আফ্রিকানিজম ধারণায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। দেশে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নিয়ে ১৯৫২ সালে ঘানার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালে বৃটেনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করলে তিনিই হন স্বাধীন ঘানার প্রথম প্রধানমন্ত্রী। ১৯৬০ সালে ঘানায় নতুন সংবিধান পাশ হয়, প্রথম প্রেসিডেন্ট হন ইঙ্ক্রুমা এবং ১৯৬৪ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু হলে আজীবন প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন।
আফ্রিকান ইউনিটি ও জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন সফল করতে নিরন্তর সক্রিয়তা এবং  বইয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তির প্রকাশ্য সমালোচনা প্রভৃতি কারণে কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইঙক্রুমার উপর ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে। ১৯৬৫ সালে Neo-colonialism: The Last stage of Imperialism বের হওয়ার পর তাদের অসন্তোষ এতটাই প্রচন্ড রূপ নেয় যে, এক বছরের মাথায় ১৯৬৬ সালে ন্যাশনাল লিবারেশন কাউন্সিলের আড়ালে সিআইএ কর্তৃক পরিচালিত এক ক্যু-এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হন কওমে ইঙ্ক্রুমা । ১৯৭২ সালে গিয়ানায় মৃত্যুবরণ করেন আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মানুষটি।
নয়া-উপনিবেশবাদের স্বরূপ উন্মোচন করে লেখা বিভিন্ন বইপত্রের মধ্যে তার বইটি অদ্যাবধি সবিশেষ গুরুত্ব পেয়ে আসছে। ইঙ্ক্রুমা রাজনীতিবিদ হিসাবে যেমন ছিলেন দূরদর্শী তেমনি বুদ্ধিজীবী হিসাবেও দু:সাহসী। Neo-colonialism: The Last stage of Imperialism বইটি তারই প্রমাণ। বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য এই গরুত্বপূর্ণ বইটি তরজমা করেছেন রাজিয়া সুলতানা। আমরা ধারাবাহিকভাবে তা প্রকাশ করবো। )


ভূমিকা.

আজকের দুনিয়ায় নয়া-উপনিবেশবাদ বাস্তবে সাম্রাজ্যবাদেরই সবচেয়ে বিপদজনক ও সর্বশেষ পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করছে। আগে একটা দেশের ওপর নয়া-উপনিবেশবাদ চাপিয়ে দিতে পারলে পরে তাকে উপনিবেশ বানিয়ে ফেলা যেত। ঊনিশ শতকের মিশর তার একটা উদাহরণ। কিন্তু এই তরিকা এখন আর কাজে আসে না। তবে পুরনো ধাঁচের উপনিবেশবাদ একবারে শেষ হয়ে গেছে তাও বলা যায় না। আফ্রিকায় এটা এখনও একটা সমস্যা। তবে অন্য সব অঞ্চল থেকে উপনিবেশবাদ পিছু হটছে। একবার একটা দেশ কোনোরকমে স্বাধীন হয়ে গেলে তাকে আবার উপনিবেশ বানানো যায় না, আগে যেটা সম্ভব ছিলো। এখনো যেসব উপনিবেশ আছে সেগুলো হয়তো আরো কিছু দিন টিকে থাকতে পারে। কিন্তু নতুন করে উপনিবেশ পত্তন করা সম্ভব না । সাম্রাজ্যবাদের মূল হাতিয়ার ছিল উপনিবেশবাদ। এখন তার বদলে পাওয়া গেছে নয়া-উপনিবেশবাদ।

নয়া-উপনিবেশবাদের সারকথা হচ্ছে–যে দেশের ওপর এইটা চেপে বসেছে সেই দেশটা স্বাধীন হলেও তার সামনে আন্তর্জাতিক শক্তির নানারকম ফাঁদ পাতা থাকে। বাস্তবে তার অর্থনীতি এবং সেই সূত্রে তার পরিচালন-নীতি বাইরে থেকে নির্ধারণ করা হয়। বাইরে থেকে নির্দেশনা চাপিয়ে দেয়ার কায়দাও নানা রকম হতে পারে। যেমন, সবচেয়ে খারাপ যেটা ঘটতে পারে তা হলো সাম্রাজ্যবাদী দেশের সৈন্যরা নয়া-উপনিবেশের দেশটিতে ঘাঁটি বানিয়ে সরকার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে পারে। তবে সচরাচর অর্থনৈতিক উপায়েই নয়া-উপনিবেশি নিয়ন্ত্রণ বহাল রাখে। যেমন নয়া-উপনিবেশে পরিণত রাষ্ট্রটিকে হয়তো প্রতিযোগিতামূলক বাজার থেকে পণ্য কিনতে না দিয়ে সম্রাাজ্যবাদী শক্তির উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী কিনতে বাধ্য করা। এ ছাড়া সরকার পরিচালনার ব্যয়ভার বহন, নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার মত পদপদবীতে থাকা সরকারি চাকুরেদের বেতনভাতা ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা প্রদান ইত্যাদির জন্য অর্থ সাহায্য দিয়েও সরকারের নীতিমালা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ব্যাংকিং সিস্টেম কব্জা করে সেই দেশের বৈদেশিক লেনদেনে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমেও নিয়ন্ত্রণের কাজটা করা হয়ে থাকে।
সচারচর আগের উপনিবেশী শক্তিই নয়া-উপনিবেশটির সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে সবসময় তাও নাও হতে পারে। যেমন দক্ষিণ ভিয়েতনাম ছিলো ফরাশি উপনিবেশ। এখন দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নয়া উপনিবেশে পরিণত হয়েছে (* বইটি রচনার সময় দক্ষিণ ভিয়েতনামে মার্কিন আধিপত্য চলছিলো- সম্পদনা পরিষদ)। আবার পরস্পর স্বার্থে যুক্ত আন্তর্জতিক কনসর্টোয়ামের মাধ্যমেও প্রভাব বজায় রাখা যায়, এরকম হলে কোনো রাষ্ট্রেরই একক প্রধান্য চোখে পড়ে না। বিশাল আন্তর্জাতিক কনসর্টোয়িামের মাধ্যমে এখন যেমন কঙ্গোকে শাসন করা হচ্ছে।
নয়া-উপনিবেশবাদের মাধ্যমে বিদেশি পুঁজি দুনিয়ার অনুন্নত দেশগুলোর উন্নয়নের কাজে তো লাগেই না বরং শোষণের কাজে ব্যয় হয়। এ ব্যবস্থায় বিদেশি বিনিয়োগ ধনী ও গরিব দেশগুলোর ব্যবধান কমায় না বরং বাড়ায় । পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো কর্তৃক অনুন্নত দেশগুলোতে পুঁজির বিনিয়োগ ঠেকানো নয়া-উপনিবেশবাদ বিরোধী সংগ্রামের উদ্দেশ্য নয়। বরং এ লড়াইয়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে আর্থিকভাবে উন্নত দেশগুলো যেন অনুন্নত দেশগুলোকে আরো ফতুর করে ফেলতে না পারে তা নিশ্চিত করা।
ঘানা ও অন্যান্য বেশ কয়েকটি দেশ যেটা করছে অর্থাৎ জোট নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ, তার অর্থ হলো সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ কিংবা মিশ্র অর্থনীতি যে অর্থনীতির দেশই হোক না কেন সকল দেশের সাথে সহযোগিতার সম্পর্ক রাখা। এ ধরণের নীতি গ্রহণের সাথে বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগের সম্পর্ক আছে। কিন্তু সেই পুঁজি বিনিয়োগ হতে হবে জোট-নিরপেক্ষ দেশটি কর্তৃক নিজ জাতীয় স্বার্থে প্রণীত পরিকল্পনা অনুযায়ী। পুঁজির বিনিয়োগ থেকে কত বেশি মুনাফা আসবে সেটি প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। পুঁজিবাদী দেশটি কোনো নয়া-উপনিবেশে বিনিয়োগ না করে যদি জোট-নিরপেক্ষ একটি দেশে বিনিয়োগ করে তাহলে সেটি তার জন্য ভালো হবে।
কথাটা হচ্ছে ক্ষমতা নিয়ে। নয়া উপনিবেশের ফাঁদে পড়া দেশের নিয়তি তার নিজের হাতে নেই। এই একটা কারণেই নয়া-উপনিবেশবাদ বিশ^ শান্তির জন্য এত বড় হুমকি। পারমানিবক অস্ত্র ক্ষমতার ভারসাম্যের ধারণাকে সেকেলে করে ফেলেছে, যার মূলে ছিলো বড় বড় যুদ্ধের অনুমোদন।
যুদ্ধ লাগলে উভয়পক্ষ মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখিন হবে তা নিশ্চিত। এই কারণে বড় শক্তিগুলার জোট আর একে অপরকে বিশ^ব্যাপী যুদ্ধ ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয় না। এর ফলে সামরিক সংঘাত ‘সীমিত যুদ্ধ’-তে রূপ নিয়েছে। এর সূতিকাগার হলো নয়া-উপনিবেশবাদ। যেসব দেশ এখনো নয়া উপনিবেশ হয়ে উঠেনি সেসব দেশেও এ ধরণের সংঘাত হতে পারে। তাদের উদ্দেশ্য হতে পারে ছোটো কোনো দেশে নয়া উপনিবেশ কায়েম করা। নয়া উপনিবেশবাদের মারাত্মক ক্ষতিকর দিকটা হলো এই যে, এর ফলে ‘সীমিত যুদ্ধের’ উদ্ভব ঠেকানোর উপযোগী বড় জোট গড়ে উঠতে পারে না। যেমন আফ্রিকার দেশগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ হতো তাহলে কোনো বৃহত জোটই সীমিত যুদ্ধ দিয়ে কোনো আফ্রিকান দেশকে বশ করার চেষ্টা চালাতো না। কেননা নিজস্ব ধরণের কারণে সীমিত যুদ্ধে যা অর্জিত হয় তা আসলেই সীমিত। যেখানে কেবল ছোটো ছোটো রাষ্ট্র আছে সেখানেই একদল মেরিন নামিয়ে বা ভাড়াটে সৈন্য দিয়ে যুদ্ধ জয় করে ফেলা সম্ভব।
তবে সীমিত যুদ্ধে সামরিক হামলার ব্যাপারে বিধিনিষেধ থাকলেও তা কোনো মতেই বিশ^শান্তির নিশ্চয়তা দেয় না। বরং এর কারণেই একদিন বৃহত শক্তির জোটগুলা বিশ^যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে, তারা যতই এড়াতে চাক না কেন। কারণ একবার শুরু হয়ে গেলে সীমিত যুদ্ধ নিজস্ব গতি পেয়ে যায়। যেমন ভিয়েতনামের যুদ্ধ। বৃহত শক্তির জোটগুলা এর বিস্তার ঠেকাতে চেয়েও পারেনি। এ জাতীয় যুদ্ধ যদিও বিশ^যুদ্ধ আটকে রাখতে পারে, তবে বহু সীমিত যুদ্ধ মিলে বরং একমুখি একটা বিশ^যুদ্ধ হয়ে উঠতে পারে যা ডেকে আনতে পারে পারমানবিক সংঘাত।

নয়া-উপনিবেশবাদ সাম্রাজ্যবাদের নিকৃষ্টতম রূপও। কারণ যারা এর প্রয়োগ করে তাদের কাছে এ হলো কোনো দায়দায়িত্ব ছাড়া ক্ষমতা, আর যাদের উপর প্রয়োগ হয় তাদের কাছে এ হলো কোনোরূপ ক্ষতিপুরণ ছাড়া কেবল অবিরাম শোষন। পুরানো ধাঁচের উপনিবেশের যুগে উপনিবেশী শক্তিকে অন্তত নিজের ঘরে কৈফিরত দিতে হতো বিদেশে সে কি করছে এবং কেন তা করা দরকার। উপনিবেশের শাসক শক্তি বিরুদ্ধ শক্তির সম্ভাব্য ক্ষতিকর পদক্ষেপের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিত। নয়া-উপনিবেশবাদের বেলায় তার কোনোটার প্রয়োজন পড়ে না। তেমনি বিশ্বযুদ্ধের হুমকির শেষে বা বিশ্বদারিদ্র চিরতরে দূর হওয়ার পর পুরোপুরি উন্নত বিশ্ব যে ধরণের সামাজিক সমস্যার মুখে পড়তে পারে তার বিষয়ে কোনো চিন্তা ভাবনা বা প্রস্তুতি নিতে দেয় না নয়া-উপনিবেশবাদ, যেমন উপনিবেশবাদও সে সুযোগ দেয়নি।
উপনিবেশবাদের মতো নয়া উপনিবেশবাদও পুঁজিবাদী দেশগুলোর সামাজিক সংঘাতসমূহ উপনিবেশে রপ্তানীর একটা উপায়। এই কায়দা যে আপাতত কাজে লাগছে তার প্রমাণ হলো দুনিয়ার গরীব ও ধনী দেশগুলোর সম্পদের ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে। এইটা হলো এই নীতিমালার অস্থায়ী সফলতা। তবে নয়া উপনিবেশবাদের ভেতরকার সংঘাত আর সংঘর্ষ নিশ্চিত করে যে এটি স্থায়ী কোনো বিশ্বব্যবস্থা হতে পারে না। তাই কিভাবে এর ইতি টানা যায় সেটা নিয়ে ভাবতে হবে উন্নত দেশগুলোকে। কারণ এই ব্যবস্থা যখন ব্যর্থ হবে তখন তাদের উপরই সেই ব্যর্থতার প্রভাব পড়বে সবচেয়ে বেশি। নয়া উপনিবেশবাদ যত বেশি দিন টিকে থাকবে আমরা ততই নিশ্চিত হবে যে এর পতন উন্নত দেশগুলোর ভিত্তিস্বরূপ প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দিবে।
যুদ্ধপরবর্তী সময়ে কেন নয়া-উপনিবেশবাদের উত্থান হলো তা সংক্ষেপে তুলে ধরা যাক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে অল্প কিছু ধনী রাষ্ট্র আর বহুসংখ্যক গরীব দেশের মধ্যে ব্যবধান ছিলো বিশাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেই অবস্থায় ফেরত যাওয়া আর সম্ভব ছিলো না। তখন এটিই ছিলো তাদের সবচেয়ে জটিল সমস্যা। এ পরিস্থিতিতে আভ্যন্তরীণ চাপ এতটাই প্রবল হয় যে জনকল্যাণমুখি রাষ্ট্রে রূপান্তরিত না হয়ে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের কোনো পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব ছিলো না। এমন কি তখন দেশে কোন দল ক্ষমতায় আছে তাও বিবেচ্য হয়ে দেখা দেয়নি। শিল্প ও কৃষি শ্রমিকদেরকে দেয়া সুযোগসুবিধা দেশভেদে কমবেশি ছিলো হয়তো; কিন্তু কোন দেশের পক্ষেই যুদ্ধ-পূর্ববর্তীকালের ব্যাপক বেকারত্ব ও নিম্ন-জীবনমানে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ ছিলো না।

ঊনিশ শতকের শেষ থেকে শুরু করে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর আভ্যন্তরীণ শ্রেণিসংঘাত মিটিয়ে ফেলার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের উৎস হিসাবে দেখা হয়েছে উপনিবেশগুলোকে। আর তাদের এই নীতি কিছুটা সফলতার মুখ দেখে, পরে আমরা যার একটা ব্যাখ্যা দেব। কিন্তু তা চূড়ান্ত লক্ষ অর্জনে ব্যর্থ হয়। কারণ যুদ্ধপূর্ব পুঁজিবাদী দেশগুলো আভ্যন্তরীণভাবে এতটাই সংগঠিত ছিলো যে, মুনাফার বড় অংশটা শ্রমিকদের পকেটে না উঠে পুুঁজিপতিদের পকেটেই জায়গা করে নেয়। এ অবস্থায় পুঁজিবাদী দেশগুলো তাদের লক্ষ্য অর্জন করবে দূরে থাক, বরং নয়া সমস্যার মুখে পড়ে। নিজ দেশের শ্রমিকরা বঞ্চিত হয়ে উপনিবেশের বঞ্চিত মানুষদের স্বার্থের সাথে নিজেদের স্বার্থ এক করে দেখতে শুরু করে। এর ফলে সা¤্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো নিজেদের আবিষ্কার করে দ্বিমুখি সংঘাতের মধ্যে: এক নিজের ঘরে অসন্তুষ্ট শ্রমিকশ্রেণি আর উপনিবেশে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠা মুক্তিকামী শক্তির সাথে।
যুদ্ধ পরবর্তি সময়ে ভিন্ন এক ধরণের উপনিবেশি নীতির অভিষেক ঘটে। উপনিবেশ থেকে অর্জিত আয় দিয়ে পুঁজিপতিদের পেট ভরানোর বদলে জনকল্যানে ব্যয় করার একটা সর্বাত্মক চেষ্টা চলে। এমনকি শ্রমিক নেতারাও এই নীতি বাস্তবায়নের পক্ষে দাড়ায়, যারা এক সময় নিজদেশের পুঁজিবাদীয় শত্রুর বিরুদ্ধে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীকে মিত্র হিসাবে দেখেছিলো।
প্রথম দিকে ধারণা করা হয় যুদ্ধপূর্ব উপনিবেশি তরিকা বজায় রেখে এই উদ্দেশ্য অর্জন করা যাবে। অচিরেই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে এতে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে এবং উপনিবেশি যুদ্ধকেই উস্কে দেবে। এবং এইভাবে চালিয়ে গেলে দেখা যাবে যে উপনিবেশী শাসনে লাভের চেয়ে ক্ষতিই হচ্ছে বেশি। এটি সবচেয়ে আগে বুঝতে পারে বৃটেন। এবং বৃটেনের বিচারবুদ্ধি যে সঠিক ছিলো তার প্রমাণ স্বরূপ দূরপ্রাচ্য এবং আলজিরিয়ায় ফরাশি উপনিবেশ পরাজিত হয়। একইভাবে ডাচরা অচিরেই সব উপনিবেশ হারায়। এ অবস্থায় নয়া উপনিবেশবাদকে নিয়ে আসা হয়। এবং অল্পদিনেই প্রমাণিত হয় এ ব্যবস্থা চমৎকারভাবে ধনীদেশগুলোর উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারছে। (ক্রমশ)


জহির হাসান

[রাজিয়া সুলতানা: কবি ও অনুবাদক। জন্ম গাইবান্ধা জেলার ব্রিজরোডে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে বিএ (সম্মান) ডিগ্রী লাভের পর যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ওখানে গণিত ও অন্যান্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষা শেষে শিক্ষকতা করছেন। তার প্রকাশিত বই: ভালোবেসে ভালো নেই (কবিতা, ২০১৫), হারপুনে গেঁথেছি চাঁদ (কবিতা, ২০১৬), কাজুও ইশিগুরো তিনটি বড় গল্প (অনুবাদ, ২০১৮) গ্লোরজানা ভিবারের নির্বাচিত কবিতাগুচ্ছ ’নৈঃশব্দ্যের কাছাকাছি‘ (অনুবাদ, ২০১৯)। দুই সন্তানের জননী রাজিয়া সুলতানা অবসর সময়ে বই পড়তে ও বেড়াতে ভালোবাসেন।]

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।