রুদ্র শায়ক
কোন শিল্পকে জানা মানে একটা পদ্ধতিকে জানা। কিন্তু শিল্পকে জানা ও বুঝার রয়েছে নানা পদ্ধতি। তাই প্রত্যক্ষ কোন শিল্পকে পুরোপুরি জানা বা বুঝা যায় না। কারণ জানা বা বুঝার প্রতিটি চেষ্টা নানা সময়ে নানা মিথস্ক্রিয়া ও সময় প্রবাহের নানা দ্যোতনায় নানা ভাবে বিন্যাসিত হয়। শিল্পের বিচার বিশ্লেষন পদ্ধতি তাই অভেদ…
পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তে নয় বরং শিল্পের সন্ধান করুণ শিল্পজ মনে আনন্দ যাপনে, উপভোগের তাড়নায় । অগ্রসর হোন হৃৎমননের স্বাধীন চেতনায়। কোন তত্ত্ব ও আদর্শের মুরিদ হয়ে, সেই সীমানায় খুঁটি গেড়ে শুধু বৃত্তই তৈরী করা সম্ভব। বৃত্তের বাইরে অনেক কিছু আছে। বৃত্ত মানেই বৃহৎ এর খন্ডিত অংশ। কাজেই তত্ত্ব যদি থাকে তা থাকুক কেবল মননের ভিত্তিরূপে। বাইরে তার সীমা আরোপক উপস্থিতি যত কম তত ভালো। মনন কিংবা চিন্তা রেখার কোন সীমা নেই। অভেদের সন্ধানে অব্যাহত হোক শিল্পজ যাত্রা।
পাশ্চাত্যের আধুনিকতাকে বুদ্ধদেব বসু মুখস্ত মেনে নিয়েছিলেন; কোন রূপ যৌক্তিক বুঝাপড়ার ধার ধারেননি। এমনকি নিজস্ব মেধা ও মননের রুচিকে প্রকাশ করেননি। উপরন্ত তিনি প্রভুত্বকামী কর্মাধ্যক্ষে পরিণত হয়েছিলেন।
এ জনপদের নিজস্ব একটা আধুনিকতার ক্রমবিকাশের পথছিল পশ্চিমা আধুনিকতার পাশাপাশি। তিনি তা এড়িয়ে গেছেন। যদিও তার সামনে উপস্থিত ছিল রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও কৃতকর্ম। তিনি এ অঞ্চলের পুরাণের পাঠ দিয়েছেন পাশ্চাত্যের অনুকরণে। কিন্তু এখানের আধুনিকতার চেহারাটা কি ভাবে তৈরি হচ্ছে অথবা হতে পারে তা তিনি বিবেচনা করেননি কিংবা করতে পারেননি। শাহ মুহাম্মদ সগীর, আলাওল, ভারতচন্দ্র প্রমুখকে ছোট করে দেখার ভেতর দিয়ে মূলত আমাদের নিজস্বতা বেহাত হয়েছে।
সাম্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশি মোড়লেরা যান্ত্রিক প্রযুক্তির বিপুল উৎকর্ষকে কাজে লাগিয়ে ; আগে গোপনে এখন প্রকাশ্যে উপনিবেশ-উত্তর জনপদের মানুষের মনে বহু বিজ্ঞাপিত পশ্চিমী সমৃদ্ধি ও চাকচিক্যের প্রতি লুদ্ধতা সংক্রমিত করে দিয়েছে চিন্তার ক্ষেত্রে। এ অন্তর্ঘাতকে মোকাবিলায় সক্ষম হয়নি আমাদের পূর্বপুরুষরা কারণ উপনিবেশের সামিয়ানার নিচে থাকতে থাকতে তাদের চেতনা ও কাঠামো থেকে তারা মুক্তি লাভ করতে পারে নাই। প্রযুক্তিকে গৃহী করে নিজের, নিজেদের মত করে সাজাতে পারে নাই। প্রয়োজনে নবায়ন কিংবা বিনির্মাণ অথবা বিকল্প গড়ে তুলতে পারে নাই।এই না পারার ব্যর্থতার ফসল নয়া-উপনিবেশিবাদ। যার প্রতিনিধি কোন একক কোম্পানি কিংবা দেশ নয় বরং বহু জাতির পুঞ্জীভূত পুঁজির নব্য রূপ সাম্রাজ্যবাদ। এজনন্য মূলত দায়ী প্রাক্তন উপনিবেশে যারা অগ্রসর মানুষ হিসাবে বিবেচিত হয়েছে তারা; তাদের সংকীর্ণ আত্মস্বার্থ ও নিজেদের বুদ্ধি বৃত্তিক সামর্থ্যকে ভুলে থাকা কিংবা কাজে না লাগানোর দৈন্যতা। এর পিছনের কাহন মননে বাসাবাঁধা হীনমন্যতার সংস্কৃতি। সার্বিক জড়তা মোচনের জন্য দরকার সংঘবদ্ধ প্রয়াস। শুধু তাই নয়, ইতিহাসের চাকাকে উল্টোপাকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যারা মরিয়া, সেই বিশ্বপুঁজিবাদ শত্রুর লেশ কিংবা শেষ রাখতে চায় না। অদূর কিংবা সুদূর ভবিষ্যতেও যাতে কোন নাছোড়বান্দা স্বপ্ন দেখে অথবা দেখিয়ে শোষণ মুক্তির তাগিদে প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ কল্পনাতেও ঠাঁই না দেয় সেজন্য আর্থসামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর মানুষের মনোভঙ্গিকে বিকৃত ও উদভ্রান্তি দিয়ে অসাড় ও পঙ্গু করার আয়োজন করছে পণ্যজীবী নয়া-উপনিবেশবাদ। তারই প্রকাশ আমরা দেখি এখনকার কোনো কোনো তথাকথিত লেখক যেখন বলেন ‘ডিকলোনাইজেশন ইজ ডেড’। পশ্চিমের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের খপ্পড়ে পড়ে মনে মনে দাস হয়ে উঠা এসব নব্য দেশীয় ফড়িয়া চরিত্র ইতিমধ্যেই অন্তরজালে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নব্য উপনিবেশের ঘাঁটি কপোরের্ট হাউজ, মিডিয়া ও দেশীয় দালাল বুদ্ধিজীবী যাদের চরিত্র ভেগ। এ সব জেনে বুঝে ঘুরে দাঁড়ানো জরুরি।
কুহক প্রলোভনের বাজারি দুনিয়ায় আজ তারুণ্য দিকভ্রান্ত, কেন্দ্রমুখি এককেন্দ্রিক জীবন ব্যবস্থা আমাদের স্রোতের মত করে তুলছে নাগরিক জীবনের মুরিদ।একগুচ্ছ ফুলের স্বপ্ন বিলাসে আমরা করেছি রক্তপাতহীন ঘৃণার ব্যবচ্ছেদ। শুদ্ধতম হৃদয়ে মানবিকতার আজ আকাল। বিশ্বায়নের আকাশচারি সংস্কৃতির আবহে মননচর্চা আজ দুরুহ হয়ে উঠছে। কোম্পানি শাসন থেকে শুরু করে পাকিস্তানি ধর্মজ উপনিবেশের মধ্য দিয়ে দৃশ্যত আজ স্বাধীন গাঙ্গেয় বদ্বীপের মানুষ যেখানে এসে দাড়িয়েছে তার সংকটের চেহারাটা এমনই। সর্নাশের কর্কশ ধ্বনিতে মলিন হয়ে যাচ্ছে কৃষিকেন্দ্রিক কৌম-সংস্কৃতি। এসব জেনে বুঝে অর্ন্তদহনে আজ প্রয়োজন পাশ্চাত্যের অনুকারী কাব্য জীবানুর দাফনকাফন।
উপনিবেশি শক্তি তার ইচ্ছা অনুযায়ী অপর কে বানাতে চায়। যাতে কোন ভাবেই সে তার মতো আগ্রাসী হয়ে না উঠে এবং মনের দিক থেকে সব সময় দূর্বল, গৌণ কিংবা ছোট হয়ে থাকে। উপনিবেশি মানুষেরা শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি সব কিছুইতে যেন ক্রমশ অন্ধকারে ডুবে যায় । কোন ভাবেই যেন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।
একরৈখিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বপরায়ণ মানসিকতা আর অবমানবিকীকরণের প্রাতিষ্ঠানিকতার দ্বারা পরিচালিত এই সমাজকাঠামো আমাদের অনুভূতি গুলোকে বাঁচতে দেয়নি কিংবা দিচ্ছে না। তাই কাউন্টার প্রতাপে ঘুরে দাঁড়াবার প্রয়াস প্রচেষ্টা অব্যহত রাখতে হবে আমাদের মননের উত্তরউপনিবেশি চাতালে।
৫০০ বছরের উপনিবেশিক লুণ্ঠনের ফলে পৃথিবীর সম্পদের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পশ্চিমের পক্ষে ঝুঁকে পড়ে। ইংল্যান্ডের মতো ছোট একটা দেশ উপনিবেশিক শোষণের ভেতর দিয়ে রাতারাতি ধনী দেশগুলোর প্রতিনিধি হয়ে উঠে। আর এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো পরিণত হয় শূন্য থলিতে। আজকের দিনে বসে দুনিয়াকে বুঝতে হলে উপনিবেশবাদের এ ইতিহাস ভালো করে বোঝা দরকার।
জ্ঞানের প্রত্নআকার যতক্ষণ স্পষ্ট হবে না, ততক্ষণ কাণ্ডজ্ঞান প্রসারিত হবে না। যতই উপরি কাঠামোতে দৌঁড়ঝাপ অব্যহত রাখুক।
প্রাচ্যদেশীয় মানুষ যদি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় মনোনিবেশ করতে চায়, তাহলে তাকে উপনিবেশি হিজেমনি বুঝতে হবে। বুঝলেই হবে না ; হিসেবের অংক কষতে হবে বিউপনিবেশায়নের মনন নিয়ে। উত্তর উপনিবেশি কালখণ্ডে এসে প্রাচ্যের বোধ চেতনায় পরিস্থিতির বিচার বিশ্লেষণ করতে না পারলে, আধুনিকতার প্রতাপের মতই নতুন করে অবিকল হেজেমনির স্বীকার হবে আমাদের মনন।
উত্তর ভাবনা কোন অপরিবর্তনীয় আকর্ষণ শক্তিতে বিধৃত নয়, নির্দিষ্ট কিংবা স্থানিক নয়, ধ্রুব নয়। তা অস্থির, দ্বন্দ্বোদ্ভূত, নিত্যবহ। সময়ান্তরিত; সময়াবদ্ধ নয়, নির্মাণে, ভাঙনে ও পুননির্মাণে, পুনপাঠে আর সমাজ সত্যায়নে চিহ্নিত অথচ ইতিহাসের বোধায়নে সংস্কৃতি ও কৃষ্টিতে নিত্য বহমান। এ যেন সময়ের চোরা-বালিতে কোনো নবীন পথিক ঘোড়সওয়ারের অপেক্ষায় -সামনে তার অবিশ্রাম বিনির্মাণ আর নব চিহ্নিায়ন।
কলোনাইজার ও কলোনাইজডদের আদান-প্রদান কখনোই হিসেব মেনে চলেনি। ইতিহাসচর্চার ধারায় আলোকায়নের কিংবা প্রাপ্তির ধারণা নিতান্তই একপেশে। ছলে-বলে-কৌশলে তা বুঝিয়ে দিয়েছে কলোনাইজররা। নবাগত ডিসকোর্সগুলো আসলে তাদেরই। এই কৌশলেই উপনিবেশী মানুষদের চিন্তা ও সংস্কৃতির উপর কায়েমিস্বত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো। এই প্রতাপের কাউন্টার জ্ঞানভাষ্য তৈরী করতে হবে উপনিবেশি অঞ্চলের জ্ঞানের প্রত্নআকারকে সময় উপযোগী যোজনার দ্যোতনা দিয়ে।
যখন উপনিবেশি সম্পর্কের অবসান ঘটে, তখনো জনগণ ও জাতিসমূহের মধ্যে আধিপত্যের সম্পর্ক বহাল তবিয়তেই ছিল। উপরন্তু, সাম্রাজ্যবাদী শাসনের নির্দিষ্ট কিছু সিলসিলা এখনো চলমান আছে, যদিও খানিকটা পরিবর্তিত রূপে। প্রত্যেকটি আধুনিকায়িত রাষ্ট্রের সম্পর্ক যেকোনো ক্ষেত্রেই শেষতক কোনো না কোনো গোষ্ঠীর সাথে একরকম সাম্রাজ্যবাদী বা উপনিবেশিক সম্পর্কচর্চাতে গিয়েই ঠেকে।
সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিশ্বের জন্য কোনো সামষ্টিক ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দেয় না; যে বিশ্বকে একত্র করার জন্য ইউরোপীয় সাম্রাজ্য, পুঁজিবাদ ও প্রযুক্তি এতকিছু করল। প্রথাগত সম্রাজ্যসমূহ তার সমস্ত ন্যায্যতা হারিয়ে ফেলেছে। যাই হোক, তারপরও এটা আমলে নিতে হবে যে, জাতিসংঘ ব্যবস্থা দাঁড় করানো হয়েছিল উত্তর-উপনিবেশিক ও উত্তর-সাম্রাজ্যবাদী এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা নিশ্চিত করতে, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ক্ষমতাধর দেশগুলো তাদের আধিপত্য চালিয়ে যাবে। শুরুতে এই ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে সবই ছিল পশ্চিমা। এমনকি এও বলা যায় যে, সাম্রাজ্যবাদ-পরবর্তী বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এতে বৈশ্বিক আধিপত্যবাদী ক্ষমতার যুগ শুরু হলো। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা বর্তমান রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এবং বর্তমানে চীন ও ভারত— এরা প্রত্যেকেই এই বৈশ্বিক-আধিপত্যশীলতার তকমাটা পেতে চেয়েছে।
উপনিবেশিকতা কেবল রাজনৈতিকভাবে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে না । উপনিবেশিক মানুষের মনে হীনমন্যতারো সৃষ্টি করে। সব বুঝেও উপনিবেশিরা বিদ্রোহ করেতে পারেনা , চিরকাল কেন্দ্রীয় শক্তির প্রভুত্ব স্বীকার করে বেঁচে থাকে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হুগলি কুঠির প্রধান জোব চার্নক ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দের ২৪ অগস্ট সুতানুটি গ্রামে আসেন৷ তার পর নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে সুতানুটির পাশের গ্রাম কলকাতা হয়ে ওঠে এক বড়ো শহর এবং কালক্রমে ভারতের রাজধানীও৷ কালক্রমে এ সুতানুটি বন্দর অঞ্চলের ভাষা কলোনিয়াল সাহেবদের যোগাযোগের ভাষা হয়ে উঠে তাদের স্থানীয় ফড়িয়াদের হাত ধরে । আবার এ ফড়িয়াদের সাথে ভালো করে যোগাযোগ স্থাপন করতেই, হিন্দু কলেজ স্থাপন করে তাদের ইংরেজি শিখানো হয় ।
ঘটনা যা ঘটনা তা না , ঘটনা হইলো এ সুতানুটি বন্দরের ভাষাই পরে আইন আদালতের ভাষা হয়ে, বই পুস্তকের ভাষা হয়ে উঠে। কলোনিয়াল প্রভুবৃত্তির যোগাযোগের ভাষা আধিপত্যের জং জারি রাখে । পরে ফোর্ট উইলিয়ামের বাবুদের বৌদ্ধিক সন্ত্রাসের কবলে পড়ে ; আমার , আমাদের মান ভাষা, প্রমিত ভাষা তথা কেতাবি ভাষা হয়ে উঠে । যা আদতে আমার বা আমাদের ভাষাই নয় । বরং ভগিরথি নদীর দুইপাড়ের ভাষা । যে জাতি মায়ের ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে, সে জাতির মদ্দাকথা গণ ভাষার স্রোত মিলেছে ভিন জনপথদর স্রোতের সাথে । এখনো মননে কলোনিয়াল শৃঙখলের , সামিয়ানার নিচে হাবুডুবু খেতে খেতে চাপা পড়ে যাচ্ছে , আমার ভাষার ভোঁআড়ি ।
উপনিবেশিতদের মনে যে উপনিবেশি শাসন বিরোধী মনোভাব জন্মায়, তা শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতারই প্রতিনিধিত্ব করে না। উপনিবেশিক শক্তির সকল পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণেরও প্রতিবাদ হয়ে ওঠে। ‘সাঁওতাল ও মুন্ডা’ বিদ্রোহ কেবল অরণ্যের অধিকার পাওয়ার প্রতিবাদ নয়। তাদের আদি সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার লড়াইও ছিলো এটা।
সভ্যতার শহর কেন্দ্রিকতা, বহুজাতিক ও বিদেশী সংস্থার মাধ্যমে গ্রামের শহরিকরণ হলো উপনিবেশিকতা বজায় রাখার চালবাজি। প্রান্তবাসি সংস্কৃতিকে ‘পিছিয়ে পড়া’ (ওল্ড ফ্যাশন) এবং শহরকে ‘আধুনিক’ ধারণায় ছড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাজার সম্প্রসারণ করাই হলো নয়া উপনিবেশিক শক্তিগুলোর কূটনীতি ।
আশিস নন্দী বলেন, ‘উপনিবেশ হলো সর্বাগ্রে চেতনাগত একটা ব্যাপার এবং শেষপর্যন্ত মানুষের মনেই এর পরাজয় ঘটাতে হবে।’
এটা ভাবা ঠিক হবে না যে নিম্নবর্গীয় প্রতিরোধ মানেই দুনিয়াকে চিরতরে উল্টেপাল্টে দেয়া। ক্ষমতা ও কর্তৃত্বক্রমের প্রশ্ন ঠিকই বিরাজ করে। নিম্নবর্গের অধ্যয়নের গুরু রণজিৎ গুহ তার ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত ধ্রপদী কিতাব Elementary Aspects of Peasant Insurgency in Colonial India-তে এ প্রসঙ্গটিই তুলে এনেছেন। ‘নিম্নবর্গের অধ্যয়ন’ সিরিজ যেই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়েছিল এই বইটা তার একটি আকর গ্রন্থ। সুতরাং, অবশ্যই নিম্নবর্গীয় প্রতিরোধ সবসময়ই মঙ্গলজনক ও দরকারিও; কিন্ত আমাদের এটা ভেবে বিভ্রান্ত হলে চলবে না যে, একসময় মার্ক্সবাদী বিপ্লবের ধারণা যেই মুক্তির কথা বলত, এই প্রতিরোধের ফলে তেমন কোনো মুক্তির আগমণ আদৌ ঘটবে কি না। ফুকো ও দেরিদার আয়াসসাধ্য অন্তর্দৃষ্টির কথা আমরা ভুলে যেতে পারি না।
গ্রামসি’র অর্গানিক বুদ্ধিজীবীর কথা নিয়ে আমরা লাফালাফি করি কিন্তু তিনি তার প্রিজন নোটবুকে তিন স্তরে বুদ্ধিজীবীর কথা বলেছেন ; ট্রাডিশনাল ও অর্গনিক আর ট্রানজিশনাল ইন্টেলেকচুয়াল। যারা আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ট্রাডিশনাল থেকে অর্গনিক হয়ে ওঠার চেষ্টা করেন তারাই ট্রানজিশনাল। আমাদের বিউপনিবিশায়নের প্রচেষ্টা মূলতই ট্রানজিশনাল ইন্টেলেকচুয়ালিটি। গ্রামচি আরো বলেন – আন্দোলনহীন নিস্ততরঙ্গ সময়কে তরঙ্গায়িত করতে। উত্তর উপনিবেশি চিন্তার ভেতর দিয়ে আমরা মূলত জাতির মননে জাত্যভিমান ও ভূ-সংস্কৃতি, স্থানীয় ভাষা ও ঐতিহ্যের উত্থান চাই, প্রয়োজনে সময়ানুগ ভাবনায় নবায়ন কিংবা বিনর্মাণ। হারাবার কিছু নেই। যা হারিয়েছি তাই ছিল আমার, আমাদের একান্ত নিজস্ব। তাই বহন করবে আমাদের পরিচয়। শেখড়চূত্য না হয়ে শেখড়ের উত্থান জরুরি ; সৃজন ও মননের চর্চার জন্য ।
হোমি ভাবার দাবি হচ্ছে যে, আমাদের প্রত্যেকেরই সংকর (হাইব্রিড) পরিচয় আছে। তিনি ‘সংকর’ (হাইব্রিড) কথাটাকে “অন্তরস্থিত বৈচিত্র্য”র নীতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। যেভাবে কেবলমাত্র অন্য ভাষার উপাদান ধার ও আত্মীকরণের মাধ্যমেই, ‘অভ্যন্তরীণভাবে বহুত্বে’র বিকাশ ঘটিয়ে কোনো ভাষা “একক” ভাষা হিশেবে নিজের পরিচয়কে বিকশিত ও শক্তিশালী করে, ঠিক সেভাবে মানুষও অভ্যন্তরীণভাবে বহুত্ব (internal plurality) অর্জনের মাধ্যমে তার সমৃদ্ধ ও একক পরিচয়কে বিকশিত করে। আমার নিজের ভাষা বাংলা। যে ভাষায় ভারতে পশ্চিম বাংলার মানুষ এবং বাংলাদেশের মানুষেরা কথা বলে। আমি একে একক একটি ভাষা হিসেবেই দেখি। মুসলমান বাঙালিরা পাকিস্তানের সাথে লড়াই করে বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছে, আক্ষরিক অর্থেই যে ভূমিতে বাংলা ভাষায় কথা বলা হয়। কিন্তু সংস্কৃত, ফার্সি, আরবি, ইংরেজিসহ অন্যন্য ইউরোপীয় ভাষা থেকে বিপুল পরিমাণে ধার করেই একটি ভাষা হিশেবে বাংলা বিকশিত হয়েছে। শুধু যে শব্দ ধার করেছে তাই নয়; বাগধারা, বাক্যাংশ এবং ব্যাকরণিক বৈশিষ্ট্যাবলিও গ্রহণ করা হয়েছে। এর মানে এই নেই যে বাংলা একটি সংকর ভাষা। বরং বলা যায় বাংলা ভাষা ঐতিহ্যিকভাবে তার চারপাশ গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হয়েছে। মূলত রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণেই, কখনো কখনো আমরা এই গ্রহণ বর্জনের বিষয়টিকে অস্বীকার করতে চাই। কিন্তু পৃথিবীতে এমন ভাষা বিরল যা গ্রহণ বর্জনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়নি।
উত্তর–উপনবিশেবাদ শিখায় ইউরোপীয় তত্ত্বচন্তিার সীমা, আমাদের মনের উপর পশ্চিমা দর্শনের অনুচতি আধিপত্য আর প্রাচ্যরে অস্বীকৃত ঐতিহাসি বিশেষত্ব। এই টানাপোড়েন শুধু আমার একার নয়। বোধহয় এই অনুভব মধ্যবত্তি নিম্নমধ্যবত্তি ঘরের সব বাঙলিরই, যারা রাজনীতি নিয়ে ভাবনা–চিন্তা করেন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার রয়েছে বিস্ময়কর সাদৃশ্য। দুই দেশই মুসলিম প্রধান ও দরিদ্র। দুই দেশেরই রয়েছে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস। ইন্দোনেশিয়া ওলন্দিাজ (ডাচ ) দের বিরুদ্ধে আর বাংলাদেশ ব্রিটিশ ও পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়েছে। দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম দুই দেশকে উপহার দেয় দুজন অবিসংবাদিত জাতীয় নেতা – সুকর্ণ ও মুজিব (বঙ্গবন্ধু )। দুই নেতাই জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশবাসীকে উপনিবেশিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করেন। স্বাধীনতাউত্তর বাস্তবতার নিরিখে কোটি কোটি জনতার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে দুই নেতাই যখন বিকল্প সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির দিকে ঝুঁকছিলেন, তখনই তাঁদের নির্মমভাবে হত্য করে সাম্রাজ্যবাদের এজেন্টরা। সামরিক অভ্যুত্থানে দশ লাখ সুকর্ণ সমর্থককে খুন করা হয়। আর শিশুপুত্র রাসেলসহ মুজিব পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে রাতের আঁধারে গুলি করে হত্য করা হয়। সিআইএ ইন্দোনেশিয়ায় প্রত্যক্ষভাবে ও বাংলাদেশে পর্দার অন্তরালে থেকে এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের দিক-নির্দেশনা দেয়। দুই দেশেরই সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ছিল মূল হোতা । বঙ্গবন্ধু এবং সুয়েকার্ণো দুজনেই ছিলেন জাতীয়তাবাদী। কিন্তু তাদের লড়াইটা ছিলো সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে। অথচ স্বাধীনতা পরবর্তী উপনিবেশি আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংস্কারে এই দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের কোনো পদক্ষেপ ছিলো না। সেক্ষেত্রে নিজেদের নিরাপত্তা বিষয়েও ছিলেন বিপজ্জনকভাবে উদাসীন।
কলোনিয়াল মাইন্ড সেটআপের ভেতরে থেকে বিউপনিবেশায়ন বুঝা যাবে না, উত্তর উপনিবেশিকতার মোকাম দূরের বিষয়। আর ‘অ’ বর্গ ও ড. বর্গ শিক্ষা কাঠামো ও প্রকাশ ভঙ্গি পাশ্চাত্যের কারাশৃঙ্খলে বন্দি। বিকল্প মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা না করলে নয়া উপনিবেশের গোপন ও প্রকাশ্য সন্ত্রাস থেকে নিস্তার পাওয়ার সুযোগ নেই। উত্তর উপনিবেশি চেতনা প্রান্তিক ও নিরুদ্ধ মনন কে জাগিয়ে তুলছে। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এ প্রতাপের কাউন্টার ভাষ্য চিহ্নায়িত হচ্ছে।
উপনিবেশী মানুষের চিন্তা আধিপত্যবাদী ডিসকোর্স গুলোকে প্রশ্ন করে দেখে না। বিকল্প কোন অবস্থান কিংবা ভাষিক বয়ান-কথন খোঁজার চেষ্টা করে না। জ্ঞানের প্রতাপহীনতায় ইতিহাস এবং রাজনীতি টিকে থাকে পরদ্ভূত বিকল্পহীনতায়। ভাষা-চেতনা-সংস্কৃতিতে প্রচল পশ্চিমা জ্ঞানভাষ্য ও ভাষ্যকারকে আইকন ভেবে নিজেরাই, নিজেদের প্রান্তিক বা অন্তেবাসী অবহেলিত অবস্থানে নিয়ে গিয়েছি।
লোকায়ত সাংস্কৃতিক উপলব্দি তথা মূলধারা কখনোই মূলধারার বা প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান নিতে পারেনি। আমাদের প্রতিবেন ও সন্দর্ভ রচিত হয়েছে কোম্পানি শাষকের হাতে তার অধীনস্ত সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর হাতে। ফলে বিশেষ গোষ্ঠীর লোকধর্মের অনুভূতিমালা স্থান করে নেয় চিরায়ত ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যর আসন। যার উজ্জ্বল প্রতিবেদন হলো বাংলা ব্যাকরণের নাম দেয়া হয়েছিলো ‘গৌড়ীয় ভাষার ব্যাকরণ’। রচিয়তা নিজেই ভিনবাসী। তার ভাষা শৃঙ্খলের কাঠামোর ভেতর দিয়ে চালান করে দেয় আমাদের ভাষা শৃঙ্খল কে। আর ঐ বিশেষ গোষ্ঠীর বিপরীতে অন্য গোষ্ঠী নিজের ভাষা রেখে অন্যের ভাষায় নিজেদের আখ্যান ও প্রতিবেদন রচনা করেন। এ অপরাপর দু বিশেষ গোষ্ঠী জন্য বেহাত হয়েছে আমাদের মৌলিকত।
উপনিবেশোত্তর সমাজে সৃষ্টি ও মনন যে সব বুদ্ধিজীবীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে তাদের চিত্তবৃত্তি উপনিবেশায়িত মোড়লদের আধিপত্য প্রবণতায় ভরপুর। চতুরদের চাইলবাজিতে বহুবিভাজিত সমাজে আমাদের দুর্বলতার সুযোগে কেন্দ্রীয় ভাবে যে সব আখ্যান ও সন্দর্ভ রচিত হয়েছে তা উপনিবেশোত্তর সমাজে কোন যথার্থ সংস্কৃতি, সাহিত্য কিংবা জীবনবোধের সূত্রপাত ঘটাতে পারেনি। নিজেরাই নিজেদের কাছে প্রত্যাখ্যাত অপর-এ পরিণত হয়েছে। এ অমিমাংসিত সামিয়ানার শৃঙ্খল ভেঙ্গে প্রকৃত ভাষ্য রচনাই উত্তর উপনিবেশী মনন চেতনার দায়-দায়িত্ব।
পৃথিবীর সমাজ-সভ্যতা ও সংস্কৃতির স্বাভাবিক গতিপথ নষ্ট হয়ে যায় কলোনিয়াল আগ্রাসনের কবলে পড়ে। দৃশ্যত পৃথিবীতে এখন আর কলোনি নেই। কিন্তু পুরো বিশ্ব জুড়ে এখনো পাশ্চাত্যের সমাজ ও সংস্কৃতির কাঠামোর বিন্যাস অব্যাহত পুরো জগত জুড়ে, একই সাথে এখনো ভাষা-শিক্ষা-সংস্কৃতি -রুচি -খাদ্যভাস -জীবন যাপনে বাসা গেড়ে বসে আছে কলোনির হেজেমনি। তার উপর বৈশ্বিক রাজনীতিতে বিশ্ব সংঘের মোড়ল হয়ে কলোনিয়ালিস্টরাই মাতাব্বরি অব্যাহত রেখেছে নয়া উপনিবেশবাদী কৌশলে। এসব জেনে বুঝে এখনই বিকল্প অবস্থান গ্রহণ জরুরি । উত্তর উপনিবেশি ভাবুক ফয়েজ আলমের ভাষায় – “আমাদের কে এখনই ঠিক করতে হবে আমরা পশ্চিমা আকাঙ্খার প্রতিমূর্তি হয়ে নয়া – উপনিবেশী দাসে পরিণত হব, না কি নিজেদের মতো করে বাঁচব। যদি নিজেদের মতো বাঁচতে চাই তাহলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি সংস্কৃতির জায়গা গুলোতেও লড়াই শুরু করতে হবে। এবং এই মুহূর্ত থেকেই।”
রুদ্র শায়ক, কবি ও প্রাবন্ধিক । জন্ম, ১৯৮৩ লক্ষীপুরে । চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ(সম্মান) ও এম এ করেছেন । প্রকাশিত বই : বাড়ির দিকে ফিরা (কবিতা ২০২২)






Users Today : 3
Users Yesterday : 3
Users Last 7 days : 12
Users Last 30 days : 54
Users This Month : 11
Users This Year : 65
Total Users : 2071
Views Today : 4
Views Yesterday : 4
Views Last 7 days : 17
Views Last 30 days : 65
Views This Month : 16
Views This Year : 78
Total views : 2928
Who's Online : 0
উপনিবেশের জগদ্দল খুব খারাপ জিনিস। প্রাবন্ধিক নির্মোহ সত্যকে তুলে ধরেছেন। ধন্যবাদ।