আসমা সুলতানা শাপলার ৫টি কবিতা

চিঠি, আজরাইলের

পরাণের গহীনে বিরহ
মাঝ রাইতে টের পাই
যেমনে ভাগ হয় বাপ-দাদার জমি
মরণের পরে যেমনে চুরি হয় মায়ের গয়না কিবা শাড়ি
এমনে ভাগ হয়া যায় পরাণের আকাশ
চুরি হয় হায়াতের আয়ুরেখা থাইকা রোশনাইয়ের রাইত
ঘুমানোর বিছানা-বালিশ
খাওনের বাটি পেয়ালা কিবা বাসের ঘর।

আমার কোনো ঘর নাই
চৈতের ঘুঘুর ডাক এই শুনি,
ফের বৈশাখে নিঃস্বর
আশ্বিনের হাওয়ার মতন
আমার দিলের ভিতর কুয়াশা কাফন উড়ে
সুবেহ সাদিকের বেলা টের পাই
একটা কইরা চিঠি রোজ রাইখা যায় আজরাইল
শরীরে আমার….

ঘর বান্ধার স্বপ্ন আমার

আমি তো নিত-নিত ঘর বান্ধি
ঘরের সামনে কিছু সবুজ ঘাস
কিছু বিলের পানি কিছু উইড়া আসা কাইম
কিংবা একটা শিউলি গাছ বসাই।
দেখি এই করে আসরের ওয়াক্তে গড়াই
ঘরের সাথে আরও কত কি বান্ধনের রীত
আমাকে নিতনিত টানে বেইলের কিনারা

সূর্য ডুবতে বসে…
আমার ঘর বান্ধার কাম
আসর হইতে মাগরিব-এশায় গড়ায়।

কিছু জাহির থাক কিছু বাতিনে

দাঁড়াইছিলাম শক্ত একগাছ
গাছের ছায়ায় দেখি অনচিনা পথিক
যারে চিনি কইয়া জানি মনে মনে
পথিক ছায়া নিছে অন্য গাছের
আমি নিজের ছায়াভাঙ্গি
কাজেই বলা যায় এইখানে একটা যুদ্ধ শুরু হইছিল
ছায়া ভাঙার যুদ্ধ।

বিষয়ের গাছ আমার আছিলোনা, এখনও নাই
তবু বাঁচি আর বাঁচাই নিজের আত্মা
আমার আছে – হারানো পরাণ, নদীর ইলিশ
রাই সরিষার ক্ষেত, পদ্মার ভাঙন কিবা যমুনার চর
আছে বান, বানের পানিতে পলি
তাতে ধানের সবুজ চারা কিষাণেরা রোয় নরোম মাটিত
চর দখলেও বাজে লাঠিয়ালের তাগত
আছে পুরানা পাপ, সকল কিছুতেই আছে
দুইশ বছরের গোলামীর চিন্।

কতবার তো ভাঙছি আর গড়ছি
ভাবতেছি, এইবেলা নয়া গড়ণের রোখে
নিজেরে ভাঙন যায় আর একবার
তাতে উইড়া যাবে কিছু উলুখাগড়া, যাক
কিছু বাসনার ভুলেভালে আসা মানুষ অথবা
কিছু মানুষী আসুক বা যাক কি আর তাতে।

গোলামির চিন্ মোছার বাসনায়
এইখানে আবার একটা যুদ্ধ শুরু হইতেই পারে
আইজ তার কিছু জাহির থাকুক
কিছুটা বাতিনে..

ঘুড়ি উড়ে ঘুড়ি নামে

ঘুড়ি উড়ে
লাটাইয়ের সূতা ছাড়ি..
ঘুড়ি উড়ে
লাটাই গুটানোর দিনগুনি
ঘুড়ি উড়ে
আকাশ বাতাসে সুরাখ
ঘুড়ি উড়ে
থাইমা থাকে বারোমাস
ঘুড়ি উড়ে
কলিজায় লাল ঘা
ঘুড়ি উড়ে
লাটাইয়ের সূতা ছাড়ি
ঘুড়ি উড়ে
আমার সিনা চাক
ঘুড়ি উড়ে
দালানের উপরে সাত আসমান

ঘুড়ি উড়ে লাটাই গুটাই
ঘুড়ি নামে
মাটির জমিনে সবুজ ঘাস
ঘুড়ি নামে
উপরে আসমান
ঘুড়ি নামে
বিলের পানিত কচুরি পানার ফুল
ঘুড়ি নামে
পুষ্কুনিতে হাঁসের ছাওয়েরা
ঘুড়ি নামে..
ঘুড়ির কি আর মাটির জমিন ভালালাগে,
বিলের পানি কিবা হাঁসের ছাও!!

নোঙর

রৈদের রঙ মরে
পাতিলের গরম ভাত পান্তা হয়
এমনে রুমালের বাঁসও হারায় একদিন
পাতা ঝইরা যাওনের দিন আইলে
গাছের কি সাধ্য সবুজের অঞ্চলে গিঁট দেয়!!
এইভাবে দিন যায় মন মরে
মন জাগে মন খোঁজে
অত সহজে কি মিলে নোঙর দেখা!!

কারো পাশ ফিরা শুইতে শুইতেই সূর্য ডুবনের কাল
কারো মোহর বিছরাইতে বেলা যায়
কারো বা সোনার মোহর অনচিনা হয় পাওনের পর
এমনে ফুরায়া যায় পহর পহর….
সামনেই সইন্ধ্যার অনচিনা ‍মুখের বয়ান

আসমা সুলতানা শাপলা

আসমা সুলতানা শাপলা, কবি ও কথাশিল্পী। জন্ম ১৯৭৩ সিলেটের সরকারী পলিটেকনিক কলোনিতে। (শাপলা সপর্যিতা নামে লিখেছেন কিছুদিন।) বাপদাদার ভিটা সুনামগঞ্জের চান্দের নগর গ্রামে। বাবা: মরহুম মোহাম্মদ আবদুল হক, মা: মরহুমা আনোয়ারা খাতুন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এম পাশ করেন। প্রকাশিত বই: গতজনমের সব দাগ (কবিতা, ২০২১), হান্ড্রেড ফেসেস অব উইমেন (আত্মজীবনিমূলক জার্নাল, ২০২১), মগ্নচৈতন্যের কবি ও কবিতা (প্রবন্ধ, ২০২০), গুপ্তহত্যা অতঃপর (গল্প, ২০১৮)। এখন ঢাকার একটা স্কুলে বাংলা বিষয়ে শক্ষিকতা করনে।


Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।