আশরাফ হাসানের ৪টি কবিতা

এখন জোসনা রাইত

এখন জোসনা রাইত
আসমানের বেসামাল আলো মাথায় লইয়া
কার কাছে যাইমু…
বেদরদী অন্ধকার পালাইছে আসামীর মতোন
দুনিয়া ঘুমাইছে দুধের শিশুর লাখান
শান্ত নদীর বুকে আইজ একটাও নৌকা নাই
গেরস্তের বাড়ির উঠানে একলা চন্দনী

আমার নাইওরি-সময়ের ঘরান আসে
অতো রাইতেও হরতালের মতোন ঘুমেরে তাড়ায়
পুষ্করনীর পাড়ে জোনাকির মেলা
ঝিঁঝিঁর ডাকে মনে অয় বিরহের পরান কাঁপে
জোয়ান চন্দনীরে খালি কান্দায়

আমি এই সোমত্ত চাঁদরে এখন কী দেখাই
গাঙ্গের রুপালি গতরে পাল তুইল্যা
যাওনের কেউ নাই
শান্ত পানিতে ভাসা পদ্মের মতোন একটাও নৌকা নাই

এখন ফকফকা জোহরা-জোসনা
আসমানের একলা থাকার সাহস দেখিয়া
আমার জবর পেরেশানি অয়…
বেসামাল আলোরে মাথায় লইয়া
আইজ আমি কার কাছে যাইমু…
বেদরদী অন্ধকার পালাইছে আসামীর মতোন।

মেঘের কান্দন

বাদাইম্যা মে’মানের লাখান এখন আর
তোমার বারান্দায় যাইতে মন চায় না।
বেবাক চন্দনী রাইত মাথায় লইয়া একলা ঘুরতে যাই
ঈম-ঠাইয়্যা শর্ষে ক্ষেতের ঘুম ভাঙ্গাইতে।

দছন-নছর মগজের উপরে ছায়া দিতে দিতে
আগরজালি গাছের আগায় সূর্য নামি গেছে ;
এখন শুধু পিছর ঘাটর পুকরিত নামিয়া
অছুর অদেখা সুখ ঠেলিয়া মাছ ধরতে মন চায়।

বিরুইন ভাত আর মুরব্বা বানানোর বাবুর্চি
ইনতেকাল করেছেন বহুত আগে ;
ছিতুরছান জীন্দেগিরে বান্ধনের মিস্তরি নাই।
মানুষের সিনার উপর ভর দিয়া খাড়াইছে
মস্তান দুনিয়াদারি।

মাগরিবের আজান অইবো অইবো মনে হয়…
চৈত-মাইয়া রোদ্র মাথায় বান্ধিয়া বরষার মেঘের
কান্দনের মতোন জমিন চাষ দিতে মন চায়।

ঘরের গন্তব্য

“লোকে বলে বলেরে ঘরবাড়ি ভালা নায় আমার
কী ঘর বানাইমু আমি শূন্যেরও মাঝার…”

ঘর নিজেকে দেখতে দেখতে আয়ুক্লান্ত হয়
বেনামি দলিলের মতো চারপাশ ঘিরে থাকে কপট হাসি
লাফায় গোধুলিমায়াচ্ছন্ন দীর্ঘ ছায়া
চাষব্যস্ত পথিক জানে না একসময় দৃষ্টিবিভ্রম আকাশকেও নামিয়ে দেয় দিগন্তে;
ঘরের দাগ-খতিয়ান তারপর বাড়ি থেকে বের হয়ে
পাখিদের গন্তব্য গলায় ঝুলিয়ে
নিজেকে দেখতে দেখতে উঠে যায় আকাশে।

ধানভানা সময়ের গীত শেষ হলে
ঘুমচোখে তাকিয়ে দেখে ফ্ল্যাট বানিজ্যের লুকোচুরি
পেরেশান দেহটা পালঙ্কে হেলান দিতেই
ডিজিটাল ব্যস্ততার মতো
ঘরগুলো বের হতে থাকে বাড়ি থেকে;

ঘর নিজেকে দেখতে দেখতে
মধ্যাকর্ষণের সকল স্ট্যাশন ভাঙতে থাকে…
নিজেকে দেখতে দেখতে উঠে যায় আকাশে।

বসন্ত-জানলা

লাল পলাশের দিকে হাত বাড়াতেই
লেজহীন ক’টি রাইফেল ঘেউঘেউ করে উঠলো
বসন্ত-জানলা ধরে আছি অবিচল।

নেড়িকুকুরের রাত পেরিয়ে
দৌড়ে গিয়েছিলাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে
নবাব স্যার সলিমুল্লাহ থেকে কার্জন হল অবধি
ভালোবাসার ছেঁড়াপৃষ্ঠা ছড়ানো।

আমাদের দীঘলবাঁকের নদীতে জাল ফেলে
পোনামাছের মতো গুচ্ছ-গুচ্ছ জলডাকাত
রূপালী ইলিশের স্বাদ নিতে নিতে
উদগুলো উঠে এসেছে ডাঙ্গায়
মানুষের বস্তিতে, ঘিনঘিনে ডাস্টবিনে কিংবা আলিশান লোকালয়ে।

প্রেমিকবরের পথ আগলে দাঁড়িয়েছে ভিলেন
প্রেমিকার জহরে নেমেছে ডগস্কোয়াড
শর্ষেক্ষেতের মতো তবু বাতাসে দামাল হিল্লোল।
মায়ের নির্ঘুম চোখের দিকে তাকাতেই
আমাদের দৃষ্টিবিভ্রম বেগুনি আকাশের মতো
বিস্তৃত করে দিলো ক্লাইভের উত্তরাধুনিক প্রেতাত্মা।
সিরাজের নুয়েপড়া পলাশী সূর্যযৌবনের লোভে
রক্তশোধিত হয় বারবার।

মায়ের নাকফুল কুড়াতে গিয়ে
তোমাকে হারিয়েছি অনেক আগেই।
লাল পলাশের দিকে হাত বাড়াতেই
তুমিও বনেদি কাটা রাইফেলের গুলির মতো গর্জে উঠলে
আমি তো ভাবলেশহীন
বসন্ত-জানলা খোলে বসে আছি অবিচল।

আশরাফ হাসান

আশরাফ হাসান, কবি ও সম্পাদক, জন্ম ১৯৭৪, সুনামগঞ্জ জেলার ছাতকের বারকাহন গ্রামে। গত শতকের নয়ের দশকের অন্যতম প্রধান কবি আশরাফ হাসানের বাবা বিশিষ্ট ইসলামি স্কলার মরহুম মাওলানা সাইদুল হাসান ও মা মরহুমা লতিফুন্নেছা খাতুন। প্রকাশিত বই: ‘দিগন্ত আজ বৃষ্টি ভরা’ (যৌথ কাব্য̈গ্রন্থ, ১৯৯৮), ‘দশ আকাশে একশ তারা’ (যৌথ কাব্য̈গ্রন্থ, ১৯৯৯), ‘সুরাহত সামগীত’ (২০১৪), পাখিলৌকিক জোছনা (২০১৯), রাইফেলগুলো প্রত্যাহার করে নাও’ (২০২০)l এছাড়া বেশ কিছু পত্রিকা-গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন l বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী, ম্যানহাটনের একটা স্কুলে পড়ান।তিনি উত্তর আমেরিকা থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা ‘গোলার্ধের’ সম্পাদক এবং অনলাইন নিউজ পোর্টাল এফএম786 ডটকম’র সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন l

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।